রৌফাবাদে রাস্তার ওপরেই ভবন নির্মাণ: বললেন ডিআরআরও’র অনুমোতি আছে

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৯-০৯ , ০৪:০২ পিএম

রৌফাবাদে রাস্তার ওপরেই ভবন নির্মাণ: বললেন ডিআরআরও’র অনুমোতি আছে ছবি: নাগরিক পত্রিকা

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদে রাস্তার ওপরেই তৈরি করছে দ্বিতল ভবন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের খোদ ডিআরআরও’র অনুমোতি নিয়েই রাস্তার ওপর বাড়ি নির্মাণ করছেন বলে জানান বাড়ি নির্মাতা জাফর। তবে, তার দাবির স্বপক্ষে কোনও অনুমোতিপত্র দেখাতে পারেনি তিনি।

রৌফাবাদে সরকারের এই মোহাজের সম্পত্তিগুলো আইন অমান্য করে বয়-বিক্রি, হস্তান্তর এবং সরকারি রাস্তা দখল নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছেই। গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সুষ্পষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রথমে ইতিবাচক সাড়া দিলেও পরে অদৃশ্য কারণে চুপ হয়ে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি নাগরিক পত্রিকা এ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ বিষয়ে খোদ ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু এ যেন ‘‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই।’’

বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সহকারী ভূমি কমিশনারকে (চান্দগাঁও) পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিলেও গণমাধ্যমকে কোনও ধরনের সহযোগিতা করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে।

নাগরিক পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, রৌফাবাদ এলাকার সমাজসেবা রোডের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি রজ্জবের গলিতে মো: কামারের ছেলে মো: জাফর একটি দ্বিতল ভবন নির্মান করছেন। ভবনটির প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্রধান সড়কের ওপর রেখে নির্মাণাধীন কাজ করছে।

জানা যায়, ১২৭৮ হোল্ডিং নম্বরের ওই জায়গাটি মমতাজের নামে বরাদ্দ বা বণ্টন (এলোটমেন্ট) করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু তিনি সরকারের এই সম্পত্তি অবৈধভাবে বিক্রি করে পুরো পরিবার নিয়ে পাকিস্তান চলে যান। পরে এটি কয়েকহাত বদলে এখন মো: জাফরের দখলে রয়েছে।

সম্প্রতি জাফর একতলা এই ভবনটিকে রাস্তার ওপর রেখে দ্বিতল ভবনে রূপান্তর করছেন। তার এই ভবন নির্মাণে কোনও অনুমোতি আছে কিনা জানতে চাইলে জাফর নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, জেলা প্রশাসনের ডিআরআরও’র অনুমোতি নিয়ে তিনি ভবন নির্মাণ করছেন। ডিআরআরও’র অনুমোতি দিয়েছেন-এমন কোনও অনুমোতিপত্র দেখাতে বললে তিনি দেখা করে অনুমোতিপত্রটি দেখাবেন বলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

পরে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও এ সংক্রান্ত কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।

রাস্তার ওপর ভবন নির্মাণে অনুমোতি দিতে পারেন কিনা এবং এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে- এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানকে একাধিকবার ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার কোনও জবাব পাওয়া যায়নি বলে তার বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা নাগরিক পত্রিকাকে জানান, এই ভবন নির্মাণ শুরু হওয়ার করেকদিন পর ডিআরআরও’র অফিস থেকে দু’জন ব্যক্তি এসে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের পর কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকলেও আবার শুরু করে। তবে, আবার কাকে বা কাদের ম্যানেজ করে কাজ শুরু করে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয় অনুবেদন অধিশাখার যুগ্মসচিব আবু দাউদ মো: গোলাম মোস্তফা নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, এসব সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব ডিআরআরও’র। তিনি অবশ্যই গণমাধ্যমকে সহযোগিতা করবেন। কেন করছেন না সে বিষয়ে তার সাথে কথা বলবেন বলে জানান যুগ্মসচিব। একইসাথে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সিটি কর্পোরেশন ও ইমারত নির্মাণ আইনে কী আছে?

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং পৌরসভা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং নকশা অনুমোদন ছাড়া কোনও ভবন নির্মাণ করা যাবে না। রাস্তার জায়গা দখল করে বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভবন তৈরি করলে, কর্তৃপক্ষ নোটিশ ছাড়াই সেই অবৈধ অংশ বা সম্পূর্ণ ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা রাখে।

এই আইনের ধারা ৩ ও ৫ অনুযায়ী, যেকোনও ভবন নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট ‘সেটব্যাক’ (রাস্তা ও সীমানা থেকে বাধ্যতামূলক খালি জায়গা) বজায় রাখতে হয়। রাস্তার ওপর সীমানা বাড়িয়ে দ্বিতল বা বহুতল ভবন নির্মাণ করা এই আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

ত্রাণ ও পুনর্বাসনের মোহাজের বা অর্পিত সম্পত্তির মূল রক্ষক হলেন প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক। তাই অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে তিনি বা তার অধিনস্থ সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা এ ধরনের অভিযোগ বা তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সহকারী ভূমি কমিশনার (চান্দগাঁও) আলআমিন নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, রাস্তার ওপর ভবন নির্মাণের কোনও সুযোগ নেই। তাছাড়া সরকারের মোহাজের সম্পত্তি বরাদ্দ, বণ্টন, বিক্রি এবং উন্নয়ন করা যাবে না।

এই অবৈধ নির্মানাধীন ভবনের কাজ বন্ধে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পত্রিকায় উল্লেখিত প্রতিবেদনে, বাহার মিয়ার সাগর গংদের কাছে সরকারের মোহাজের সম্পত্তির হোল্ডিং নং- ৬৯, ৭০, ৭১ বিক্রয়ের বিষয় এবং ভূমিদস্যু ইকবাল হোসেন রনির অবৈধ দখল থেকে বিএস ১ নং খতিয়ানের ৯১ নং দাগের ০.২৪ একর সম্পত্তি উদ্ধারে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয় নির্দেশনা দিয়েছেন। যে কোনও সময় সরকারের এসব সম্পত্তি উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান সহকারী ভূমি কমিশনার।

এ সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

রৌফবাদে উর্দুভাষীদের জমি ক্রয়-বিক্রিয় যেন থামছেই না

রৌফবাদে বেদখল জায়গা উদ্ধার করে দেয়াল নির্মাণ করা হবে: ডিআরআরও

মোহাজের সম্পত্তি উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী

রৌফবাদের বেদখল মোহাজের সম্পত্তি: তদন্তের নির্দেশ এসি ল্যান্ডকে

রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সাইনবোর্ড খুলে জায়গা দখল ভূমিদস্যু রনিং গংয়ের

জেলা প্রশাসনের ভূমি দখল: ভূমিদস্যু রনির অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন