বায়েজিদে সমিতির আড়ালে অবৈধ ব্যাংকিং: গ্রাহক টানতে অবাস্তব লোনের প্রলোভন

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৯-২৯ , ১১:১০ এএম

বায়েজিদে সমিতির আড়ালে অবৈধ ব্যাংকিং: গ্রাহক টানতে অবাস্তব লোনের প্রলোভন ছবি: নাগরিক পত্রিকা

সমবায় সমিতির আড়ালে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অভিনব কায়দায় অবৈধ ব্যাংকিং ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে 'ফিউচার ডেভেলপমেন্ট কর্মজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড' (রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৩৮৬২) এর বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন অক্সিজেন এলাকার তামান্না বিল্ডিংয়ে অফিস খুলে সাধারণ মানুষকে আকর্ষণীয় লোনের প্রলোভন দেখিয়ে দেদারসে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে আমানত।

মাত্র ৬ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করলেই মিলবে ৩০ হাজার টাকার লোন—এমনই এক অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে অক্সিজেন ও এর আশেপাশের এলাকায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। তবে সমবায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত সমবায় আইন ও বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে চালানো এই কার্যক্রম আসলে বড় ধরণের আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ।

বালুচরা এলাকায় সাইকেল পার্টস ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ নাগরিক পত্রিকাকে জানান, আমাকে ৩০ হাজার টাকা লোন দিবে বলে ফিউচার ডেভেলপমেন্ট কর্মজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড এর ছোহলাবাই মারমা (রিমি) নামে এক মাঠ কর্মী পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শ মতে, ৩০ হাজার টাকা লোন পেতে হলে ৬ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করতে হবে এবং লোন প্রদানের পর প্রতিদিন ৫শ টাকা করে লোন পরিশোধ করার কথা জানান।

আব্দুর রশিদ জানান, ওই মাঠ কর্মীর পরামর্শে আমি গত ৬ সেপ্টেম্বর একটি একাউন্ট খুললে তারা আমাকে একটি পাশবই প্রদান করে।

জানা যায়, ওই পাশ বইয়ে আব্দুর রশিদের সদস্য নম্বর ১৭১৩ এবং কেন্দ্র নম্বর ৯ উল্লেখ রয়েছে।

রশিদ নাগরিক পত্রিকাকে জানায়, আমি ৩ হাজার ৩শ টাকা সঞ্চয় করার পর হঠাৎ একদিন তারা লোন দেওয়া সম্ভব না- জানিয়ে একাউন্ট বন্ধ করে দেয়। পরে আমি চাপ দিয়ে আমার সঞ্চিত অর্থ ফেরত নিতে সক্ষম হই।

একই এলাকার মো: নিজাম নাগরিক পত্রিকাকে জানান, তার কাছ থেকে ৪৩৫০ টাকা সঞ্চয় নিয়েছে। তাকে ৫০ হাজার টাকা লোনে প্রতিশ্রুতিতে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করতে বলেন মাঠ কর্মী। তার পাশবইয়ে সদস্য নম্বর ১৭০৬ এবং কেন্দ্র নম্বর ৯ উল্লেখ রয়েছে।

আইন ভেঙে যত্রতত্র সঞ্চয় সংগ্রহ

বাংলাদেশ সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী, যেকোনো সমবায় সমিতি শুধুমাত্র তার নিজস্ব খাতায় নামভুক্ত ও শেয়ার কেনা 'নিবন্ধিত সদস্যদের' সাথেই আর্থিক লেনদেন করতে পারে। রাস্তা থেকে আসা কোনো সাধারণ মানুষ বা অসদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় নেওয়া বা লোন দেওয়া সমবায় আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বায়েজিদের অক্সিজেন এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি সমবায় অধিদপ্তরের এই কড়া নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই সঞ্চয় সংগ্রহ করছে, যা স্পষ্টত অবৈধ ব্যাংকিং।

অবাস্তব গাণিতিক হিসাব: ‘হায় হায়’ কোম্পানির ছক

আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরণের অফারগুলো মূলত 'পঞ্জি স্কিম' বা 'হায় হায় কোম্পানি'র মতো কাজ করে। যদি ১০০ জন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা করে মোট ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়, তবে তাদেরকে ৩০ হাজার টাকা করে লোন দিতে প্রয়োজন হবে ৩০ লাখ টাকা। সমবায় সমিতির নিজস্ব কোনো কেন্দ্রীয় তহবিল না থাকায় এই বাড়তি ২৪ লাখ টাকা জোগাড় করা অসম্ভব প্রায়।

মূলত শুরুর দিকে নতুন গ্রাহকদের জমানো টাকা দিয়ে পুরাতন গুটিয়েক গ্রাহককে লোন দিয়ে বিশ্বস্ততা অর্জন করা হয়। পরবর্তীতে যখন বিপুল পরিমাণ মানুষ মোটা অংকের টাকা জমা দেয়, তখন পুরো তহবিল নিয়ে রাতারাতি অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যায় এই ধরণের ভুঁইফোড় চক্র। অক্সিজেন এলাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরল মানুষরাই মূলত এই প্রলোভনের মূল শিকার হচ্ছেন।

তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা: জেলা সমবায় অফিসার

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসার সিফাত উল্লাহ তাসনিম নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, "কোনো সমবায় সমিতির সাধারণ জনগণ বা রাস্তার পাশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এভাবে প্রকাশ্য সঞ্চয় সংগ্রহ করা বা অবাস্তব লোনের প্রলোভন দেখানোর কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। এটি সমবায় আইনের পরিপন্থী এবং এক ধরণের অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম। 'ফিউচার ডেভেলপমেন্ট কর্মজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে তাদের নিবন্ধন বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" তিনি সাধারণ মানুষকে এই চটকদার ফাঁদে পা না দেওয়ার এবং যেকোনো সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ডের তথ্য নিকটস্থ সমবায় কার্যালয় বা প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান।

পুরো বিষয়টির প্রক্রিয়া এবং সত্যতা জানতে 'ফিউচার ডেভেলপমেন্ট কর্মজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর পরিচালক বিজয় বড়ুয়ার কাছে জানতে কল করা হলে তিনি, সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।