নাগরিক পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের জের

রৌফবাদের বেদখল মোহাজের সম্পত্তি: তদন্তের নির্দেশ এসি ল্যান্ডকে

 রোমান শেখ
আপডেট: ২০২৬-০৮-২৫ , ০৮:১১ পিএম

রৌফবাদের বেদখল মোহাজের সম্পত্তি: তদন্তের নির্দেশ এসি ল্যান্ডকে ছবি: নাগরিক পত্রিকা

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফবাদ এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে নাগরিক পত্রিকার ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। সরকারি সম্পত্তি বেদখল, জায়গা-জমি কেনাবেচা এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগগুলো এখন তদন্তের আওতায় এসেছে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

নাগরিক পত্রিকার প্রথম প্রতিবেদনে রৌফবাদে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর জায়গা কেনাবেচার একটি ঘটনা সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হোল্ডিং নম্বর ৬৯, ৭০ ও ৭১-এর প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গা লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা ক্রয় করেন।
জায়গাটি প্রায় ৪৭ লাখ টাকার বিনিময়ে কেনা হয় বলে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে সেখানে প্রায় ২০টি ভাড়াঘর নির্মাণ করে
‘বাহার মিয়া কলোনী’ গড়ে তোলা হয়।

প্রতিবেদনে জায়গাটিতে আবাসিক গ্যাস সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, তারা ২০১১ সালের দিকে জায়গাটি কেনেন; অথচ ২০০৯ সালের পর আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার বিষয়টি সামনে আসে।

প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে সরকারি জায়গা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং অতীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

এরপর দ্বিতীয় প্রতিবেদনে উঠে আসে আরও বিস্তৃত চিত্র। নাগরিক পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, রৌফবাদ এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১৬ একর সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৮ দশমিক ৪১ একর জায়গা বেদখল হয়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উর্দুভাষী পরিবারগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত জায়গার পাশাপাশি সরকারের খালি জায়গাতেও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও বহুতল ভবন, কোথাও দোকানপাট, আবার কোথাও বসতঘর নির্মাণের তথ্য সামনে আসে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এরপর তৃতীয় দফায় বিষয়টি আরও উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু রৌফবাদসহ বিভিন্ন জেলার বেদখল হয়ে যাওয়া মোহাজের সম্পত্তি উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান। তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, এলএ ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফাও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, এডিসি এলএ, ইউএনও, এসিল্যান্ড ও ডিআরআরওসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারের নামে খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি দ্রুত উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর যেসব সম্পত্তির ক্ষেত্রে এলএ মামলার নথি রয়েছে, সেসব নথি পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাগরিক পত্রিকার প্রতিবেদনের আলোকে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ডিআরআরওকে বেদখল সম্পত্তি উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনার কথাও জানান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব।

সবশেষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক চাঁন্দগাঁও এসিল্যান্ডকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তদন্তে কোন জায়গা সরকারের নামে রয়েছে, কোনটি বরাদ্দপ্রাপ্ত এবং কোন সম্পত্তি কীভাবে হাতবদল হয়েছে—তা নথিপত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। বেদখল জায়গায় নির্মিত স্থাপনার অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার, বিদ্যুৎ-পানি ও গ্যাস সংযোগের বৈধতাও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, সরকারি সম্পত্তি বেদখল হওয়া নিয়ে প্রতিবেদনের আলোকে এসি ল্যান্ড চাঁন্দগাঁওকে তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রৌফবাদের মোহাজের বেদখল সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চাঁন্দগাঁও এসি ল্যান্ড নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাকে প্রতিবেদনের আলোকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হোল্ডিং নাম্বারের জায়গা সরেজমিনে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদনের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।’

এ সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

রৌফবাদে উর্দুভাষীদের জমি ক্রয়-বিক্রিয় যেন থামছেই না

রৌফবাদে বেদখল জায়গা উদ্ধার করে দেয়াল নির্মাণ করা হবে: ডিআরআরও

মোহাজের সম্পত্তি উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী