রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সাইনবোর্ড খুলে জায়গা দখল ভূমিদস্যু রনিং গংয়ের

 রোমান শেখ
আপডেট: ২০২৬-০৮-২৯ , ১১:২১ এএম

রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সাইনবোর্ড খুলে জায়গা দখল ভূমিদস্যু রনিং গংয়ের ছবি: নাগরিক পত্রিকা

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন রৌফবাদ এলাকার ত্রাণ ও পুনর্বসানের সরকারি সম্পত্তি ভূমিদস্যুরা তাদের দখলে নেওয়া যেন নিত্যনৈমিত্তিক রুটিনে পরিনত হয়েছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে কোনও ধরনের বাধার সম্মুখিন না হয়ে একের পর এক করে যাচ্ছে জায়গা দখল। সম্প্রতি নাগরিক পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদনে সচিবালয় এবং জেলা প্রশাসকের দৃষ্টিগোচর হলেও তাদের অধিনস্ত সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তাদের নিরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সরকারের মোহাজের বেদখল সম্পত্তি উদ্ধারে সম্প্রতি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয় অনুবেদন অধিশাখার যুগ্মসচিব আবু দাউদ মো: গোলাম মোস্তফা।

পত্রিকায় উল্লেখিত হোল্ডিং নাম্বার এবং চিহ্নিত জায়গার বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে জেলা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নির্দেশ দিয়েছেন সহকারী ভূমি কমিশনার (এসি ল্যান্ড- চান্দগাঁও) মো: আলআমিনকে।

নাগরিক পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, রৌফবাদে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত সোলায়মানের ছেলে ইকবাল হোসেন রনির (৩৬) নেতৃত্বে রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বসানের সরকারি দেয়াল নির্মিত ১ নং খতিয়ানের ০.২৪ একর জমি, বিএস দাগ নং-৯১ একটি সম্পত্তির সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলে সেটি দখল করে রিকশার গ্যারেজ নির্মান করেন। ওই সাইনবোর্ডে উল্লেখ ছিল, ‘সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি, এই সম্পত্তির মালিক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম।’ যা মৌজা-পশ্চিম ষোলশহর, থানা পাঁচলাইশ (বর্তমান-বায়েজিদ) তফশিলে উল্লেখ রয়েছে।

একই জমি চলতি বছরের জানুয়ারির ২০ তারিখে চট্টগ্রামের সাবেক ডিআরআরও ছাইফুল্লাহ মজুমদার ৫১.০১.১৫০০.২১১.৯০.০০৭.২৪ স্মারকে সরেজমিনে তদন্ত পূর্বক সত্যতা পাওয়ায় ভূমিদস্যু ইকবাল হোসেন রনির কাছ থেকে উদ্ধারে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেন।

কিন্তু জমিটি কী কারণে উদ্ধার করা গেল না-এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক ডিআরআরও নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ‘মার্চে আমার বদলিজনিত কারণে চট্টগ্রাম থেকে চলে আসতে হয়েছে।’ ফলে, পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক মহোদয় কী ব্যবস্থা নিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভূমিদস্যু ইকবাল হোসেন রনি ইতিমধ্যে সেখানে বিদ্যুতের সংযোগ স্থাপন করেছেন। একটি আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য সাধারণত মালিকানার প্রমাণে জমির দলিল, লিজ ডিড, নামজারির কাগজ বা পর্চা। মূল মালিক না থাকলে উত্তরাধিকার সনদ বা বৈধ ভাড়ার চুক্তিপত্র এবং অনুমোদিত নক্সার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাড়ি বা ভবনের অনুমোদনে দরকার হয়। সরকারি এই জায়গায় রনি কীভাবে বিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে তা নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলের 'মুরাদপুর' বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ছানা উল্লাহর সাথে।

তিনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, সংরক্ষিত সরকারি সম্পত্তিতে এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগের সুযোগ নেই। তথ্য উপাত্ত সঠিক হলে সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ অভিযুক্তর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন রনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, এই জায়গাটি আমি দেখাশোনা করছি। এটি আমার বাবার ভাইয়ের মামা শ্বশুরের জায়গা বলে জানি। আমার বাবা সোলায়মানের সাথে একটি চুক্তিপত্র আছে। আমার বাবার মামা শ্বশুর বাদশা মেম্বারের সাথে সোসাইটির এই জায়গা নিয়ে একটি মামলা চলমান আছে। রনি বলেন, সরকার যদি আমাকে ছেড়ে দিতে বলে তাহলে আমি ছেড়ে দিবো। আমি এখানে কয়েকটা দোকান আর একটা রিকশার গ্যারেজ করে খাচ্ছি।

বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে পেলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অনেক আগে থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে, কীভাবে পেয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) মাসুদুর রহমান ফোন রিসিভ না করায় তার কোনও বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, সহকারী ভূমি কমিশনারকে (এসিল্যান্ড-চান্দগাঁও) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সব ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা তাকে গ্রহন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত সরকারের সম্পত্তি এভাবে দখল করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থ গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি।

নাগরিক পত্রিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের (মোহাজের সম্পত্তি) রৌফবাদে ১৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৮ একর ১৪ শতাংশ জমি বেদখলের ধারাবাহিক প্রতিবেদন করবে- এমন তথ্য অবগত করা হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, যুগ্মসচিব আবু দাউদ মো: গোলাম মোস্তফা এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে। তারা রিপোর্টে উল্লেখ করা প্রতিটা জায়গাকে অ্যাড্রেস করা হবে বলে জানান। ইতিমধ্যে, রৌফবাদের হোল্ডিং ৬৯,৭০,৭১ নাম্বারের জায়গাটির বিষয়ে সহকারি ভূমি কমিশনারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। 

সরকারের এ ধরনের জমি কেউ দখল করছে-এমন তথ্যে স্থানীয় পুলিশের করণীয় কী?

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া মাত্রই পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি দায়বদ্ধতা রয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধ ও শান্তি রক্ষায় সরকারি জমি জবরদখল করা বা সেখানে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। পুলিশ অ্যাক্টের ১৮৬১-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, যেকোনও অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধ করা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের অন্যতম প্রধান আইনি দায়িত্ব।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) ফোন রিসিভ না করায় তার কোনও বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় ভূমি সহকারী কমিশনার বা এসিল্যান্ড এবং ইউএনও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারেন। স্থানীয় এসিল্যান্ড বা ইউএনও-র নির্দেশনা বা মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে পুলিশকে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা আছে আইনে।

বিষয়টি নিয়ে সহকারী ভূমি কমিশনার (এসিল্যান্ড চান্দগাঁও) মো: আলআমিন নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

 এ সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

জেলা প্রশাসনের ভূমি দখল: ভূমিদস্যু রনির অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন