সিটিজেন নিউজে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ২০২০-০৬-০৮ , ০৯:৫০ এএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
চট্টগ্রাম নগরীর এক সময়ের মূর্তিয়মান আতঙ্ক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ খান। চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে কেঁপেছে পুরো নগরী। বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ৮ খুনের ঘটনায় আতঁকে উঠেছে পুরো দেশ। গ্রেফতার আর কারাভোগেও স্বস্তি ছিলো না জনমনে। কারা অভ্যন্তরে থেকে চালিয়েছে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবসা। আইনের ফাঁক-ফোঁকড় দিয়ে জামিন নিয়ে পালায় দেশ ছেড়ে। কিন্তু চট্টগ্রামে রয়ে যায় তার গড়ে তোলা ৬ টি সিন্ডিকেটে বিশাল বাহিনী। সাজ্জাদের নির্দেশনায় থেমে নেই তাদের বাহিনী কতৃক অস্ত্র ব্যবসা আর চাঁদাবাজি।
শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ বাহিনীর ত্রাসের রাজত্বে চট্টগ্রামে আবার কারা কারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে- এমন অনুসন্ধান চালায় নাগরিক পত্রিকা। এ নিয়ে নাগরিক পত্রিকায় শিবির ক্যাডারদের নামসহ বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রতিবেদনের সত্যতা পায় পুলিশ। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্রসহ শিবিরের ১০ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে আসে: শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ খানের ৬ সদস্যের সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে মো: ফিরোজ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকাইয়া আকবর, সরওয়ার ওরফে বাবলা, নূরনবী ওরফে ম্যাক্সন ও মঈনুদ্দিন রাশেদ ওরফে ভাগিনা রাশেদ।
চট্টগ্রামে সাজ্জাদের সক্রিয় এই ৬ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৩০ জনের কয়েকটি গ্রুপ। থার্ড লেভেলে থেকে কাজ করা এই গ্রুপে আছে- গিয়াস, এরশাদ, আজাদ, বাবুল, গিট্টু মানিক, রুহুল আমিন ওরফে হাসান, এনাম, আজিজ, আ: কাদের সুজন, পারভেজ, সুইডেন সোহেল, আকতার, জাবেদ, মিজান, ইয়াছিন, আরিফ, রাসেল, রুবেল, রায়হান, জসিম উদ্দিন রানা, গিট্টু নোমান, মহিউদ্দিন, রাজন, ইকবাল, বেলাল, মোরশেদ, বাছা মিয়া, মান্নান ও শাহজাহান।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে: দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সরওয়ার, মো. আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবর,মো. ফিরোজ,মো. আব্দুল কাদের সুজন,মো. রুহুল আমিন,মো. জাবেদ প্রঃ ভাইনে জাবেদ,মো. তুহিন প্রঃ তুফান , রায়হান আহম্মেদ রনি, মো. ইকবাল ও মো. মিজান ।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ‘কাতার থেকে শিবির ক্যাডার ম্যাক্সন-সরওয়ারের চাঁদাবাজি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম নাগরিক পত্রিকা। সংবাদটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের নজরে আসে। ওই সংবাদ প্রকাশের পর নাগরিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদককে মোবাইল ফোনে শিবির ক্যাডার সরওয়ার ও ম্যাক্সন কাতার থেকে এবং চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকিসহ পত্রিকার অফিস ও বাসায় হামলা চালানোর হুমকি দেয়।
এ ঘটনায় সাংবাদিক রোমান শেখ বায়েজিদ বোস্তামী থানায় বিস্তারিত জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি নং...) করে বিষয়টি সিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ‘সাংবাদিককে শিবির ক্যাডার সরওয়ার-ম্যাক্সনের হুমকি’ শিরোনামে প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশ এবং হত্যার হুমকি দেয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ তদন্ত শুরু করলে কেঁচো খুড়তে সাপ রেবিয়ে আসে। মাঠে নামে গোয়েন্দা পুলিশ এবং বায়েজিদ থানার একটি অভিযানিক দল। তথ্য পেয়ে শুরু করে অভিযান।
১ম অভিযান: গত বছরের ২৪ অক্টোবর, গভীর রাতে বায়েজিদ থানাধীন ওয়াজেদিয়াস্থ বাবুল সাহেবের মাঠে এলাকায় শ্বাসরুদ্ধ অভিযান চালিয়ে ৫ শিবির ক্যাডারকে আটক করে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৫টি একনলা বন্দুক, ৫টি কার্তুজ, স্টীলের তৈরী ১টি ছোরা, স্টীলের তৈরী ২টি চাপাতি উদ্ধার করা হয়।
২য় অভিযান: চট্টগ্রামের আলোচিত ৮ মার্ডারের অন্যতম আসামী শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ খানের অন্যতম সহযোগী সরওয়ার ওরফে বাবলাকে ২৯ ডিসেম্বর রাতে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি,শনিবার সন্ধ্যায় নাগরিক পত্রিকায় ‘অবৈধ অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে শিবির ক্যাডার সরওয়ারের হেফাজতে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর রবিবার (৯জানুয়ারি) ভোরে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ সরওয়ারের হেফাজত থেকে একটি একে-২২ রাইফেল,৩০ রাউন্ড গুলি, ২টি এলজি ও ৪টি কার্তুজ উদ্ধার করে।
৩য় অভিযান: গত ৫ এপ্রিল, নাগরিক পত্রিকায় চট্টগ্রামে আবারও সক্রিয় সাজ্জাদ বাহিনীর ক্যাডাররা শিরোনামের ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ফিরোজের অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরা হয়। পরে গত ১লা মে,বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ রাতে অভিযান চালিয়ে দুর্ধর্ষ ওই সন্ত্রাসী ফিরোজকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করে।
৪র্থ অভিযান: নাগরিক পত্রিকায় চলমান অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় গত ২৯ এপ্রিল, গোয়েন্দা পুলিশ লক্ষীপুর জেলায় অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের সহযোগী মো. আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে (৩০) অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে। পরে তার দেয়া তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সিএমপির বায়েজীদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলী পূর্ব মসজিদ জব্বার সওদাগরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ০১টি দেশীয় তৈরী আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি) ও ০২ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।
৫ম অভিযান: নাগরিক পত্রিকায় প্রকাশিত ৩০জনের মধ্যে মো. ইকবাল ও মো. মিজানের নাম উঠে আসার কয়েকদিন পরই পুলিশের জালে আটক হয় তারা। গত ৫জুন, রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ হাজিপাড়া এলাকা থেকে তাদের আটক করে। এসময় তাদের তল্লাশী করে একটি একনলা বন্দুক, তিনটি শর্টগানের গুলি ও ৪শ’ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রিটন সরকার নাগরিক পত্রিকাকে জানান, কাতার থেকে শিবির সন্ত্রাসী ম্যাক্সন ও সরওয়ারের চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশের পর থেকে পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে সাংবাদিক রোমান শেখকে হুমকি দেয়াসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা নেয়ার বিষয়ে সতত্য পাওয়া যায়। পরে পুলিশ বিভিন্ন সময়ে ভিযান চালিয়ে শিবিরের ১০জন সন্ত্রাসীকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করে।
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (বায়েজিদ জোন) পরিত্রাণ তালুকদার নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, চাঁদাবাজি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে পুলিশ এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে জানা যায়, শিবির সন্ত্রাসী সরওয়ার, ম্যাক্সন ও সাজ্জাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে তাদের পালিত কিছু সন্ত্রাসী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি করছে। পরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান তিনি।
সিএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক নাগরিক পত্রিকাকে জানান, সিটিজেন নিউজে যাদের নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাদের বিষয়ে আমরা যাচাই-বাছাই ও গোয়েন্দা তথ্য ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গুলি ও মাদকসহ ১০জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা।
নগর বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) উপ পুলিশ কমিশনার আব্দুল ওয়ারিশ নাগরিক পত্রিকাকে জানান, নাগরিক পত্রিকায় অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাননীয় পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে আমরা ওই প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্ট থানা ও গোয়েন্দা পুলিশকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দিই। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে শিবিরের ১০জনকে গ্রেফতার করে।
বিষয়টি নিয়ে সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আবার প্রকাশিত হোক-এটা আমি চাই। কারণ, অনুসন্ধানী প্রতিদেনগুলোকে আমরা গুরুত্বের সাথে দেখি এবং সে আলোকে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে।’
এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, ‘সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, সে ভোল পাল্টে যতই আওয়ামী লীগ করুক বা ছাত্রলীগ, যুবলীগ করুক; সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতের তথ্য পেলে কেউ ছাড় দেয়া হবে না।’
আরও পড়ুন:
শিবির ক্যাডার সরওয়ারের ২ সহযোগী অস্ত্রসহ গ্রেফতার
আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ফিরোজ বায়েজিদে গ্রেফতার
অস্ত্রসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর গ্রেফতার
শিবির ক্যাডার সরওয়ারের হেফাজতে `আরও অস্ত্র’ রয়েছে!
অবৈধ অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে শিবির ক্যাডার সরওয়ারের হেফাজতে
শিবির ক্যাডার সরওয়ার ইমিগ্রেশনে গ্রেফতার; আনা হচ্ছে চট্টগ্রামে
শিবির ক্যাডার সরওয়ার-ম্যাক্সন কাতারে গ্রেফতার!
চট্টগ্রামে শিবিরের ৫ ক্যাডার অস্ত্রসহ গ্রেফতার
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.