৯/১১: গণমাধ্যম, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এবং জনমতের রাজনীতি

 মুরাদ হোসেন । মিশিগান প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৮-০৬ , ০৯:১৩ এএম

৯/১১: গণমাধ্যম, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এবং জনমতের রাজনীতি ছবি: নাগরিক পত্রিকা

প্রথম পর্বে ৯/১১ হামলার তাৎপর্য এবং গণমাধ্যমের প্রাথমিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু হামলার পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়, সেটিই হয়তো বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ সবচেয়ে বেশি বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিসব ক্ষেত্রেই ৯/১১ একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।

হামলার অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস USA PATRIOT Act পাস করে। এই আইনের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে ফোনকল, ই-মেইল, ইন্টারনেট ব্যবহারসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণের বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়। সরকারের যুক্তি ছিলসন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে এটি অপরিহার্য। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা অনেক প্রতিষ্ঠান তখন থেকেই প্রশ্ন তোলে, নিরাপত্তার নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা কতটা সংকুচিত করা যেতে পারে?

একই সময়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করছে। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে সেই যুদ্ধের বিস্তার ঘটে ইরাকে। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যুক্তি তুলে ধরলেও, পরবর্তীকালে এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধকে ঘিরে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং দেশটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু যুদ্ধের পর সেই অস্ত্রের অস্তিত্বের পক্ষে প্রত্যাশিত প্রমাণ আর পাওয়া যায়নি। ফলে সমালোচকদের একটি বড় অংশের মতে, ইরাক যুদ্ধের পেছনে কেবল নিরাপত্তা নয়, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও কাজ করেছিল।

৯/১১-এর পর জনমত গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় আসে। টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং পরবর্তীকালে ইন্টারনেটসব মাধ্যমেই হামলার দৃশ্য, উদ্ধার অভিযান এবং সন্ত্রাসবাদের খবর দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারিত হতে থাকে। অনেক গণমাধ্যম গবেষকের মতে, কোনো দৃশ্যের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং একসময় সেটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

এখানেই প্রশ্ন ওঠেগণমাধ্যম কি কেবল তথ্য পরিবেশন করেছে, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ানও শক্তিশালী করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল গবেষকের মতে, হামলার পর বহু সংবাদমাধ্যমে মুসলিম পরিচয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের মনে ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে একই পরিসরে ভাবার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে অনেক সাংবাদিকের যুক্তি, হামলার জন্য দায়ী সংগঠনগুলোর পরিচয় তুলে ধরা ছিল সংবাদ পরিবেশনের স্বাভাবিক দায়িত্ব; সেটিকে পুরো গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে ৯/১১-এর পর পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণা-অপরাধ এবং সামাজিক সন্দেহের ঘটনা বেড়ে যায়। বিমানবন্দরে অতিরিক্ত তল্লাশি, ধর্মীয় পোশাক পরা ব্যক্তিদের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা অভিবাসীদের ওপর নজরদারিএসব বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

গণমাধ্যমের সমালোচকেরা বলেন, কিছু চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও ভিডিও গেমেও আরব বা মুসলিম চরিত্রকে বারবার সহিংস বা সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এই ধরনের উপস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে জনমতের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে অন্যদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গণমাধ্যমের অনেকেই যুক্তি দেন, এগুলো নির্দিষ্ট বাস্তব ঘটনার শিল্পভিত্তিক উপস্থাপন, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তৈরি করা নয়।

এখানেই ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বকে বোঝার জটিলতা। একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অন্যদিকে নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা; একদিকে সন্ত্রাসবাদের বাস্তব হুমকি, অন্যদিকে কোনো ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখার ঝুঁকিএই দুই বাস্তবতার মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতি গত দুই দশক ধরে এগিয়েছে।

৯/১১-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গণমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পর্ক। সংকটের সময় রাষ্ট্র যে ভাষা ব্যবহার করে এবং গণমাধ্যম সেই ভাষাকে কীভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়তা জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ৯/১১-এর ইতিহাস শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে গণমাধ্যম, রাষ্ট্র এবং জনমতের সম্পর্ক বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। (দ্বিতীয় পর্ব)

'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।