মুরাদ হোসেন । মিশিগান প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৮-০৭ , ০৩:৪৪ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
৯/১১-এর ঘটনার দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, গণমাধ্যম এবং জনমতের আলোচনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসের কিছু ঘটনা কেবল একটি সময়কে নয়, ভবিষ্যতের বহু সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ছিল তেমনই একটি ঘটনা।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তান ও ইরাকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার পথ তৈরি করে। সমর্থকদের মতে, এসব অভিযান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিতিশীলতার জন্ম হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।
৯/১১-পরবর্তী সময়ে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গণমাধ্যমের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের সময় সরকার যে তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করে, গণমাধ্যম সেই তথ্য কীভাবে প্রচার করছে এবং জনগণ তা কীভাবে গ্রহণ করছে—এসবই একটি জাতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
লেখকের দৃষ্টিতে, ৯/১১-এর ঘটনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনমতের একটি বড় অংশ গণমাধ্যমের ধারাবাহিক উপস্থাপনার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়েছে। তবে এই পর্যবেক্ষণকে একটি বিশ্লেষণধর্মী মতামত হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ ৯/১১ নিয়ে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা ও মতভেদ রয়েছে। কোনো একক ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো ঘটনাকে মূল্যায়ন করা কঠিন।
বিশ্বজুড়ে বহু গবেষক মনে করেন, সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করতে হলে কেবল সামরিক শক্তি নয়, রাজনৈতিক সমাধান, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের দায় একটি পুরো ধর্ম, জাতি বা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। এমন প্রবণতা শুধু বিভাজন বাড়ায়, সমস্যার সমাধান করে না।
৯/১১ আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ভয় মানুষের বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে পারে। সংকটের মুহূর্তে আবেগ প্রায়ই যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়। তাই যেকোনো বড় ঘটনার পর নাগরিক, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সবারই উচিত তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যের বিস্তার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভুল তথ্যও একই গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ইতিহাসের যেকোনো বড় ঘটনাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণা এবং বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের বিকল্প নেই।
৯/১১ শুধু একটি ট্র্যাজেডির নাম নয়; এটি একই সঙ্গে মানবসভ্যতার জন্য একটি সতর্কবার্তা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে যেন কোনো নিরপরাধ জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার না হয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেন সবসময় তথ্য, আইন ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গৃহীত হয়—এই শিক্ষাই হয়তো ৯/১১-এর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
ইতিহাসের বিচার সবসময় সময়ের সঙ্গে আরও পরিপূর্ণ হয়। নতুন দলিল, নতুন গবেষণা এবং নতুন বিশ্লেষণ অতীতকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। তাই ৯/১১ নিয়েও প্রশ্ন থাকবে, গবেষণা চলবে এবং বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। তবে একটি বিষয়ে দ্বিমত নেই—সেদিনের সেই হামলা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল এবং তার অভিঘাত আজও বিশ্বব্যবস্থায় অনুভূত হয়।
প্রশ্ন তোলার অধিকার যেমন গণতন্ত্রের শক্তি, তেমনি তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণই সত্য অনুসন্ধানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। ইতিহাসের বড় ঘটনাগুলোকে তাই আবেগ নয়, প্রমাণ, গবেষণা এবং যুক্তির আলোতেই মূল্যায়ন করা উচিত। (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)
'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.