মুরাদ হোসেন । মিশিগান প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৭-২০ , ০৭:১৫ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
মিশিগান—যুক্তরাষ্ট্রের একটি মনোরম অঙ্গরাজ্য। সবুজ বনভূমি, নির্মল প্রকৃতি, অসংখ্য হ্রদ এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এই রাজ্যকে প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার হিসেবে গড়ে তুলেছে। আমার কাছে মিশিগান যেন এক আশীর্বাদপুষ্ট ভূমি, যেখানে প্রকৃতি প্রতিনিয়ত মানুষকে প্রশান্তি, সৌন্দর্য ও ভালোবাসার বার্তা দেয়।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেও রয়েছে কিছু সামাজিক বাস্তবতা। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশের আচরণ অনেক সময় হতাশার জন্ম দেয়। ব্যক্তিস্বার্থ, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং একে অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এসব প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রশ্ন জাগে—কেন এই বিভাজন? কেন আপনজনের সঙ্গে প্রতারণা? কেন আমরা নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করে তুলব? বিদেশের মাটিতে আমরা প্রত্যেকে শুধু ব্যক্তিগত পরিচয়ের নয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধেরও প্রতিনিধি। তাই আমাদের প্রতিটি আচরণে দায়িত্ববোধ ও সততার পরিচয় থাকা প্রয়োজন। মিশিগানের প্রকৃতি আমাদের সহাবস্থান, সহমর্মিতা ও উদারতার শিক্ষা দেয়; সেই শিক্ষাই আমাদের সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
মেট্রো ডেট্রয়েট অঞ্চলকে সুযোগ ও সম্ভাবনার এক উর্বর ক্ষেত্র বলা যায়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার নানা সুযোগ এখানে রয়েছে। একজন নবাগত যদি সঠিক তথ্য ও আন্তরিক সহযোগিতা পান, তবে খুব সহজেই নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কখনো কখনো ভুল তথ্য, অযাচিত পরামর্শ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে নতুনরা বিভ্রান্ত হন। তাই নতুন পরিবেশে আসা প্রত্যেকের উচিত যথাযথ তথ্য যাচাই করা এবং আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
মিশিগানের নির্মল নীল আকাশ, সবুজে ঘেরা পার্ক, চাঁদের আলোয় আলোকিত রাত, অসংখ্য হ্রদ এবং শান্ত পরিবেশ মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। এখানকার প্রকৃতি শুধু চোখ জুড়ায় না, মনকেও সমৃদ্ধ করে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ থেকে আমার বড় বোন এখানে বেড়াতে এসেছিলেন। মিশিগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝে এমন পরিবেশ সত্যিই বিরল।
লেক ওরিয়ন (Lake Orion) মিশিগানের অন্যতম আকর্ষণ। স্বচ্ছ জলরাশি, সবুজ গাছপালা এবং শান্ত পরিবেশ একে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থানে পরিণত করেছে। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটালেই মন সতেজ হয়ে ওঠে এবং নতুন উদ্যমে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এই হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। পাশাপাশি, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায়ও এ হ্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মিশিগানের আরেকটি বড় শক্তি এর বহুসাংস্কৃতিক সমাজ। এখানে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, চীনা, ক্যালডিয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেন। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটি সমন্বিত সমাজ গড়ে তুলেছেন। এই বৈচিত্র্যই মিশিগানের অন্যতম সৌন্দর্য।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও মিশিগান সমৃদ্ধ। এখানে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত উন্নত। গ্রেহাউন্ড বাস, স্থানীয় গণপরিবহন, আন্তঃরাজ্য ট্রেন, উবারসহ আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে। এছাড়া ডেট্রয়েট মেট্রোপলিটন ওয়েন কাউন্টি বিমানবন্দর (DTW) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে মিশিগানকে যুক্ত করেছে।
সবশেষে, মিশিগানে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের প্রতি আমার একটি আন্তরিক আহ্বান—বিদেশের মাটিতে আমরা যেন পারস্পরিক সহযোগিতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। আমরা যদি একে অপরের পাশে দাঁড়াই, বিভেদ নয় বরং ঐক্যের চর্চা করি, তাহলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হবে। মিশিগানের বিশাল হ্রদ, সবুজ প্রকৃতি ও নির্মল পরিবেশ আমাদের উদার হতে শেখায়। আসুন, সেই উদারতা, সৌহার্দ্য ও মানবিকতাকে নিজেদের জীবনেও ধারণ করি।
'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.