মুরাদ হোসেন । মিশিগান প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৭-১৪ , ০৯:৫০ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
এই দেশ এবং এর শোষকগোষ্ঠী—বাংলাদেশ ও এর জনগণের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশা, জীবন এবং মিথ্যার এক জটিল সমীকরণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট, বকেয়া মজুরি এবং দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে এখানে বসবাস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই সবুজ দেশে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক কিছু থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে সবকিছুই যেন নিয়ন্ত্রিত; নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ারও সুযোগ নেই। পর্দার আড়ালে থাকা কোনো এক পক্ষকে অর্থ দিতেই হয়—এমন একটি ব্যবস্থা যেন সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক শ্রেণি ও কাঠামোর বেড়াজাল মানুষকে এমন এক অন্ধকার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে, যা ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। প্রতিদিন ক্ষুধার হাহাকার শোনা যায়, কিন্তু তা শোনার বা দেখার মতো কেউ নেই। নোংরা রাজনীতি এবং নেতাদের দাপটে অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা যেন নিজেদের ভাবমূর্তি ও স্বার্থ রক্ষাতেই ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই; তাদের হয়ে কথা বলার মানুষও যেন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। এসব এখন আর গোপন কিছু নয়; বরং এক নির্মম বাস্তবতা। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সেই সবুজ পতাকা যেন আজ বিবর্ণ হয়ে গেছে, আর সমাজের একেবারে তলানিতে বসবাসকারী মানুষের কাছে স্বাধীনতা কেবলই এক অধরা স্বপ্ন।
ভাবুন এমন এক পরিস্থিতির কথা, যেখানে কেউ প্রকৃত সমস্যা নিয়ে কথা বলে না; সবাই কেবল নিজেদের স্বার্থ কিংবা লোকদেখানো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত। মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, ক্ষুধার্তরা হাহাকার করছে, সাধারণ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টে ভুগছে—অথচ কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। গত নির্বাচনের দিকে তাকান—কী অর্জন হলো? আমরা কি কিছু পেলাম, নাকি আরও কিছু হারালাম? নাকি এটি ছিল গণতন্ত্রের এক বড় পরাজয়? অনেকের বিশ্বাস, রাজনীতিবিদরা কেবল নিজেদের সাজানো মঞ্চই ধরে রেখেছেন। তখন প্রশ্ন জাগে—কোথায় সেই স্বাধীনতার চেতনা? কোথায় আবু সাঈদের সেই আত্মত্যাগ—সেই তরুণ, যিনি অনেকের কাছে সাহস ও আত্মত্যাগের এক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত?
আজকাল বাংলাদেশে যেন কেউ কারও কথা শোনে না, কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না, আর ন্যায়বিচারও যেন ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নানা প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ (Hate Crime) বেড়েছে এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিষ্টাচারের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার মান যেন কেবল এক কৃত্রিম প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই টিকে থাকার লড়াই কঠিন হয়ে পড়েছে এবং সর্বত্র অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব দৃশ্যমান। মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ভোগান্তির শিকার। অনেকে মনে করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে মানুষের উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে।
অপার সম্ভাবনাময় তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে আমি নতুন আলোর দিশা দেখতে পাই—যেখানে দেশ ও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এটি যেন ঘোর অন্ধকারের মধ্যে এক আশার আলো। এই চেতনাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে এবং দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর আদর্শ ও নৈতিকতাকে আমাদের আত্মার গভীরে ধারণ করতে হবে; যেমন আমরা আমাদের জাতীয় পতাকাকে হৃদয়ে ধারণ করি, তেমনি সেই মূল্যবোধও আমাদের জীবনচর্চার অংশ হওয়া উচিত।
একজন প্রকৃত নেতা নিজের জাতি ও জনগণের জন্য কাজ করেন। তিনি সর্বদা ভাবেন, কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা যায়। এই ভাবনাই তাঁকে ভেতর থেকে আলোড়িত করে এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তিনি থেমে থাকেন না। যদি তিনি নিজের ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সবার কল্যাণে কাজ করার উদ্দেশ্যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন, তবে তা ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু যদি পুরো রাজনৈতিক পরিবেশই কলুষিত হয়ে পড়ে এবং জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও স্বাভাবিক। জনগণের পরিবর্তে কেবল দলীয় স্বার্থে কাজ করা নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা হারায়।
পরিশেষে বলা যায়, জীবন নিয়ে আশা রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। জীবনের গভীর তাৎপর্য ও সৌন্দর্য রয়েছে। পথ কঠিন হলেও তাকে সহজ করে তোলা আমাদেরই দায়িত্ব। আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং জাতি, দেশ, জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্মান করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে একদিন আমাদের দেশ ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাবে এবং আমরা সবুজ-লাল পতাকার প্রকৃত মর্যাদা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারব।
'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.