রোমান শেখ
আপডেট: ২০১৯-০৯-২২ , ০১:১৬ পিএম
ছবি: ইন্টারনেট
চট্টগ্রামের কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শিবিরের ক্যাডার ম্যাক্সন-সরোয়ার কাতার থেকে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কাতার থেকে ইন্টারনেটের বিভিন্ন নাম্বার ব্যবহার করে কিছু ব্যবসায়ীদের ফোন করে মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে। দাবিকৃত চাঁদা না দিলে ব্যবসা বন্ধ করাসহ মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছে। সিটিজেন নিউজের অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
নূর নবী ওরফে ম্যাক্সন। আরেক সন্ত্রাসী সরওয়ার তার ঘনিষ্ট বন্ধু। অনেকে মানিকজোড় বলে ডাকলেও এখন অনেকটা ভাটা পড়েছে সে সম্পর্কে। গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে জামিনে মুক্ত হয়ে দেশে কিছুদিন অবস্থান করলেও পরে পালিয়ে যায় কাতারে। যদিও তাদের জামিনের বিষয়টি তৎকালীন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. মুজিবুর রহমান সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশসহ সব গোয়েন্দা সংস্থাকে বিষয়টি জানিয়ে সবার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ২০১৭ সালের ১সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় সরওয়ার ও ম্যাক্সনকে জামিনে মুক্তি দেয়।
তাদের জামিনে মুক্তি পরবর্তী নজরদারির বিষয়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেছিলেন, 'শিবির ক্যাডার ম্যাক্সন ও সরওয়ারের জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয় সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে। তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে বিষয়ে পুলিশি নজরদারি চলছে বলে জানালেও শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনি তাদের পালিয়ে যাওয়া।
তবে, জামিনে বেরিয়ে তাদের নিজ এলাকা বায়েজিদ থানাধীন আতুরার ডিপোর জাঙ্গালপাড়া ও চালিতাতলীতে কিছুদিন অবস্থান করলে তৎকালীন বায়েজিদ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামের জামায়াত সখ্যতার কারণে তাদের পালাতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর মুরাদপুর, বিবিরহাট এবং নয়ারহাট (কয়লারঘর) এলাকা কিছু ব্যবসায়ী রিকন্ডিশন (ব্যবহৃত) গাড়ির যন্ত্রাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এনে বাংলাদেশে পাইকারি এবং খুচরা বিক্রয় করে। ম্যাক্সন ওইসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিভিন্ন পন্থায় প্রায় ২০লাখ টাকা চাঁদা নিচ্ছে। আর চাঁদার এসব টাকা সংগ্রহ করছে ম্যাক্সনের ৩টি গ্রুপে অন্তত ২০জন সদস্য। তারা চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে একটি অংশ তারা রেখে বাকি টাকা কাতারে পাঠাচ্ছে। ওই সকল ব্যবসায়ীরা পরিবার এবং জানের ভয়ে নীরবে তাদের দাবিকৃত চাঁদা দিয়ে আসছে। কেউ প্রতিবাদ বা আইনী ব্যবস্থা নিতে গেলেও পড়েছে নানান ঝামেলায়।
সূত্র জানায়, কারাগারে থাকা অবস্থায় শিবির ক্যাডার ম্যাক্সন ও সরওয়ার পরপর দুটি মোবাইল নম্বর ০১৭০৬৭৭৪৩২২ ও ০১৭১৫৭১৯৫৫২ থেকে ফোন করে বায়েজীদ বোস্তামি থানা এলাকার বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী জাকির হোসেনের কাছ থেকে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ২০১৫ সালের ২৬ জুন শুক্রবার রাতে প্রবাসীর কাছ থেকে ওই চাঁদার টাকা আনতে ম্যাক্সন ও সরওয়ারের সেকেন্ড-ইন কমান্ড আরমান হাজারী ও সালাউদ্দিন সাজুকে পাঠায়। প্রবাসী জাকির হোসেন সন্ত্রাসী ম্যাক্সনের চাহিদামতো চাঁদা দিতে অপারগতা জানালে আরমান ও সাজু ক্ষিপ্ত হয়ে প্রবাসীর বাড়ি লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ওই রাতেই অক্সিজেন অনন্যা আবাসিক এলাকায় অবস্থানরত শিবির ক্যাডার সালাহউদ্দিন সাজুকে গ্রেফতার করতে গেলে সে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্রসহ সাজুকে গ্রেফতার করা হয়।
অতীতের এমন একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে ওই সকল প্রবাসী ব্যবসায়ীরা ভয়ে মুখ খুলতে চায় না ম্যাক্সন ও সরওয়ারের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে থাকা তাদের ওই ৩টি গ্রুপের সদস্যরা মুরাদপুর, বিবিরহাট ও নয়ারহাট কয়লারঘর এলাকা থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে এবং তাদের পারিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেয়। পরে ওই নাম্বারগুলো ম্যাক্সন ও সরওয়ারকে দিলে তারা কাতার থেকে ফোন করে ওই ব্যবাসয়ীদের কাছে চাঁদাদাবি করে বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দেয়। এরপর ম্যাক্সন ও সরওয়ার বিষয়টি দেশে থাকা তাদের সিন্ডিকেটের ওই সদস্যদের জানালে তারা আবার ওই ব্যবসায়ীদের ফোন করে চাঁদা বুঝিয়ে দিতে বলে।
দেশে থেকে যারা চাঁদা আদায় করছে: বাবুল, হাসান, গিট্টু মানিক, রুহুল আমিন, এনাম, ঢাকাইয়া আকবর, আজিজ, আ: কাদের সুজন, পারভেজ, সুইডেন সোহেল, আকতার, জাবেদ, মিজান, ইয়াছিন, আরিফ, রাসেল, রুবেল, রায়হান, জসিম উদ্দিন রানা, গিট্টু নোমান, মহিউদ্দিন, রাজন, ইকবাল, মোরশেদ ও শাহজাহান।
এদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে ডাকাতি, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কয়েকজন কারাগারে থাকলেও এখনও সক্রিয় আছে অন্তত ২০জন। এরা নয়ারহাট, চালিতাতলী, ওয়াজেদিয়া, কয়লারঘর, অক্সিজেন, আতুরার ডিপো, জাঙ্গালপাড়া, হাজিপাড়া, হাজিরপুল এলাকার স্থানীয় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। এদের নাম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুবাই প্রবাসী এক ব্যবসায়ী জানায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে কাতার থেকে ম্যাক্সন +৯৭৪৫০৫৫২৪৪৮ নাম্বার থেকে ফোন করে ৪লাখ টাকা দাবি করে। চাঁদার টাকা দিতে না পারলে মুরাদপুরে থাকা তার যন্ত্রাংশের দোকান জ্বালিয়ে দিবে বলে হুমকি দেয়।
তিনি বলেন, দুবাই থেকে তিনি গাড়ির যন্ত্রাংশ কিনে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে পাঠায়। মুরাদপুরে ওই যন্ত্রাংশ তার কর্মচারি সেসব যন্ত্রাংশ বিক্রি করে আবার ব্যাংকে টাকা জমা করে। চট্টগ্রামে থাকা ম্যাক্সনের নাম দিয়ে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে একজন ওই প্রবাসীর দোকানের কর্মচারিকে ফোন করে চাঁদার টাকা বুঝিয়ে দিতে হুমকি দিয়েছে ০১৮৬৪-৩৫০৩৭৩ নাম্বার হতে।
সিটিজেন নিউজের অনুসন্ধানে চাঁদা চাওয়া ওই রবি নাম্বার হাসান নামে ব্যবহার করছে বলে জানা যায়।
একই শর্তে আরও এক ব্যবসায়ী জানায়, ম্যাক্সন তার কাছ থেকে গত ৮মাস যাবত প্রতি মাসে ৫০ হাজার করে চাঁদা নিচ্ছে। চাঁদা না দিলে দেশে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিতো। তিনি বলেন, আমার দুটি ছোট শিশু সন্তান রয়েছে; তারা স্কুলে যায়। পরিবারের কথা চিন্তা করে ম্যাক্সনকে তিনি প্রতি মাসে চাঁদা দিয়ে আসছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ম্যাক্সনের পক্ষে দেশ থেকে এ চাঁদা আদায় করছেন হাসান নামে এক যুবক। তিনি এর চেয়ে বিস্তারিত আর কোনও তথ্য দিতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে সিটি এসবি’র উপ পুলিশ কমিশনার আব্দুল ওয়ারিশ সিটিজেন নিউজকে জানান, ‘শিবির সন্ত্রাসী ম্যাক্সন ও সরওয়ার পালিয়ে কাতারে অবস্থান করছে বলে লোকমুখে শুনেছি। তবে, আমরা তাদের অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চত হতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ম্যাক্সন ও সরওয়ারের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারলে তাদের গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তা চাইবো।’ তাদের গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার মাহাবুব রহমান সিটিজেন নিউজকে জানান, ‘শিবির সন্ত্রাসী ম্যাক্সন ও সরওয়ার দেশ ছেড়ে কীভাবে পালালো সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত না। তবে, আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনী তাদের অবস্থান এবং কর্মকান্ডের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ম্যাক্সন, সরওয়ার ছাড়াও আরও কিছু তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী পালিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছে; যাদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এবং তাদের ইন্টারপোলের সহায়তায় গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির ব্যবস্থার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে সুপারিশ করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, ‘চাঁদার বিষয়ে যদি পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ না করে তবে ওই সকল সন্ত্রাসীদের নিয়ে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করুক। আমরা রিপোর্ট যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা করবো।’
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.