সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষক মহিদুলের চাকরি বাঁচাতে মিথ্যা প্রতিবেদনে রক্ষাচেষ্টা এডিপিইও’র

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৮-১৮ , ০৩:৫৪ পিএম

সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষক মহিদুলের চাকরি বাঁচাতে মিথ্যা প্রতিবেদনে রক্ষাচেষ্টা এডিপিইও’র ছবি: নাগরিক পত্রিকা

ফৌজদারি মামলায় তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত একজন সহকারী শিক্ষককে রক্ষায় মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এডিপিইও) মো: আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধ। নাগরিক পত্রিকায় গত ১ জুলাই ‘‘প্রতারণা মামলায় সাজা: স্থায়ী চাকরি হারাতে পারেন কথিত শিক্ষক মহিদুল’’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদনটি খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক এবং বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের দৃষ্টিগোচর হলে এ বিষয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে এডিপিইও মো: আমিনুল ইসলামকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তিনি পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখিত সাজা মামলার বিষয়ে কোনও তদন্ত না করে বরং অভিযুক্ত আসামীর প্রদান করা একটি ভুয়া কাগজের ওপর ভিত্তি করে সাজাপ্রাপ্ত আসামী কথিত শিক্ষক মহিদুল ইসলামকে বাঁচাতে তিনি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

যেখানে অভিযুক্ত শিক্ষক মহিদুলের চাকরি বাঁচাতে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে পক্ষপাতিত্বের ষ্পষ্ট নজির পাওয়া গেছে।

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের টাকা আত্মসাৎ মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক মহিদুলের ৩ মাসের সাজা হয়েছে। জাগরণী চক্রের বাগেরহাটের বাঁধাল শাখার ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, পিতা: সেকেন্দার আলি, মাতা: মিনারা বেগমের সন্তান মো: মহিদুল ইসলাম জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন থেকে লোন নিয়ে ফেরত না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার কাজল কুমার কীর্তনিয়া বাদী হয়ে বাগেরহাট আদালতে একটি এনআই অ্যাক্টের মামলা দায়ের করেন।

কাজল কুমার কীর্তনিয়া নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ‘আসামী মহিদুল ইসলাম জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের লোন পরিশোধ না করে ৯৪ হাজার ১শ’ ৭৭ টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে আমি বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে ওই মামলায় আদালত টাকা আত্মসাতের প্রমান পেয়ে মহিদুলে বিরুদ্ধে ৩ মাসের সাজা রায় ঘোষণা করেন।’

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের পক্ষে আইনজীবী শাহিন নাগরিক পত্রিকাকে জানান, সিআর মামলা নং-১৮/২১, কচুয়া এসসি-৬৫০/২১ মামলায় মো: মহিদুল ইসলাম, পিতা: সেকেন্দার আলি, মাতা: মিনারা বেগমকে গত ২৩ এপ্রিল ২০২৪ ইং তারিখে আদালত ৩ মাসের সাজা ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন।

মহিদুলের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রকাশিত সাজা মামলার তথ্য /নাম্বারটি সঠিক কি-না তা সংশ্লিষ্ট আদালতে গিয়ে ক্রসচেক/যাচাই করলেন না কেন- এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক মহিদুল একটি কাগজ দেখিয়েছেন যেখানে তিনি ‘পত্রিকায় উল্লেখিত ওই মহিদুল’ না বলে দাবি করেন। মহিদুলের প্রদান করা ওই কাগজটি সঠিক কি-না সেটি যাচাই করেছেন কি-না এমন প্রশ্নে তিনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, আপনার কোনও সন্দেহ থাকলে আপনি আবার রিপোর্ট করেন।

মামলাটির তথ্য-উপাত্ত যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আদালতে না গিয়ে স্কুলে কেন গেলেন- এমন প্রশ্নেও কোনও জবাব দেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম।

এডিপিইও তার তদন্তে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত শিক্ষক মহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা রয়েছে কিন্তু পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৩ মাসের সাজার কোনও মামলা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেই।

নাগরিক পত্রিকা অভিযুক্ত আসামী মহিদুলের বিরুদ্ধে ৮টি সক্রিয় মামলা রয়েছে বলে মামলা নাম্বার উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশিও অস্ত্রসহ সশস্ত্র ডাকাতির সময়ের ভিডিও ফুটেজসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা এডিপিইও আমিনুল ইসলাম, ওই শিক্ষককে বাঁচাতে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য এড়িয়ে গিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরীন আকতার নাগরিক পত্রিকাকে জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা উভয় পক্ষে উল্লেখিত তথ্য ক্রসচেক/যাচাই করলেন না কেন; বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মোঃ শফিকুল ইসলামকে ফোনে পাওয়া যায়নি বলে তার কোনও বক্তব্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

তবে, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা অফিসার (মহাপরিচালকের দপ্তর) মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে বিষয়টি ভালোভাবে অবগত করতে নাগরিক পত্রিকাকে অনুরোধ করেন। যদি তারা কোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন না করে তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিবেন বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, এরআগে নাগরিক পত্রিকায় কথিত স্কুল শিক্ষক মহিদুল একটি প্রতারণা মামলায় কারাগারে উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সেই প্রতিবেদনে আলোকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত করে তার সত্যতা পেলে আসামী মহিদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এরপর মহিদুলকে নিয়ে নাগরিক পত্রিকা অনুসন্ধান শুরু করলে প্রতারণা মামলা, টাকা আত্মসাৎ, চুরি, বাড়িঘরে আগুন, হত্যাচেষ্টা, লুটপাট, সশস্ত্র ডাকাতি, স্কুল কক্ষের শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে বিচার-শালিসসহ বহু অভিযোগের নথিপত্র এবং সক্রিয় ৮টি মামলা নাম্বার উল্লেখ করে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

কথিত স্কুল শিক্ষক বরখাস্তের আগে বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৩৬ নং পশ্চিম গাজীরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ছিলেন।

এ সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

জজের বন্ধু সেজে স্কুল শিক্ষক মহিদুলের প্রতারণা; টাকা আত্মসাৎ

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিন মাস আত্মগোপনে ছিলেন স্কুল শিক্ষক মহিদুল

অগ্নিসংযোগ, চুরি, ছিনতাইসহ ডজন মামলার আসামী শিক্ষক মহিদুল

প্রতারণা মামলায় সাজা: স্থায়ী চাকরি হারাতে পারেন কথিত শিক্ষক মহিদুল