প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিন মাস আত্মগোপনে ছিলেন স্কুল শিক্ষক মহিদুল

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৩-০৭-০৪ , ০৮:১৬ পিএম

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিন মাস আত্মগোপনে ছিলেন স্কুল শিক্ষক মহিদুল ছবি: নাগরিক পত্রিকা

হিদুল ইসলাম। ওরফে মহিদুল গাজী। পেশায় একজন প্রাইমারি স্কুলের সহকারি শিক্ষক হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। প্রতারণা করে টাকা আত্মসাৎ করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এঁকেছিলেন দুর্ধান্ত ফাঁদ। নিজেকে জজের বন্ধু পরিচয় দিয়ে মামলা থেকে আসামীদের খালাস করিয়ে দিবে বলে ভুক্তভোগিদের টাকা আত্মসাৎ করে সে যাত্রায় সফল হতে না পেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিন মাস আত্মগোপনে ছিলেন স্কুল শিক্ষক মহিদুল।

পরে এ ঘটনায় পুলিশের দীর্ঘ সময়ের তদন্তে বেরিয়ে আসে কথিত শিক্ষক মহিদুলের প্রতারণার ছলা-কলার কৌশল।

মহিদুল বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৩৬ নাম্বার পশ্চিম গাজিরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি একই এলাকার সেকেন্দার আলীর ছেলে।

মহিদুল কখনও সেনাবাহিনীর ক্যাপ (টুপি) ব্যবহার করে নিজেকে সেনা কর্মকর্তা কখনও আইনজীবী কখনও বিচারকের বন্ধু বা আত্মীয় পরিচয় দিতেন। তিনি বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে আদালত প্রাঙ্গনে ঘুরতেন এবং অসহায় বিচারপ্রার্থীদের টার্গেট করতেন।

২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মহিদুল বাগেরহাট নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল আদালত বাগেরহাট-২ এর আদালতের একটি মামলায় ২ আসামীকে খালাস করানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে দফায় দফায় এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। সেদিন মামলায় রায়ে আসামীদের সাজা ঘোষণার পরই প্রতারক মহিদুল আদালত পাড়া থেকে সটকে পরে।

ভুক্তভোগির আত্মীয়রা ফোন করলে মোবাইল বন্ধ করে রাখে মহিদুল। পরে মহিদুলের স্ত্রী তার স্বামীকে ফিরে পেতে আশ্রয় নেয় আইনের। বাগেরহাট সদর থানায় করেন একটি সাধারণ ডায়েরী। কথিত শিক্ষক মহিদুলের স্ত্রী মৌসুমি আক্তার এবং তার ভাই অহিদুল গাজী পুলিশকে তথ্য দেয় যে, মামলার কাংক্ষিত ফলাফল না পাওয়ায় মহিদুলকে আসমী পক্ষের লোকজন টাকা আদায়ের জন্য অপরহণ করে রেখেছে।

এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করে তাদের অভিযোগের কোনও সত্যতা পায়নি।

দীর্ঘ ৩ মাস ৯দিন পর হঠাৎ বাড়ি ফিরলেন মহিদুল ইসলাম। কোথায় ছিলেন-পুলিশের এমন প্রশ্নের জবাবে মহিদুল জানান তাকে জ্বিনে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিল। এদিকে দীর্ঘ দিন স্কুলে উপস্থিত না থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

মোড়েলগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, উপজেলার ১৩৬ নাম্বার পশ্চিম গাজিরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীর্ঘ প্রায় তিন মাস স্কুলে অনুপস্থিত ছিলেন। আমরা তাকে শোকজ করেছি। শোকজের এক লিখিত জবাবে মহিদুল জানান যে, তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু মহিদুল দেখাতে পারেননি কোনও মেডিকেল সনদ।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহিন জানান, মহিদুল বাড়িতে ফিরে এসেছে শুনে আমি তাকে থানায় ডাকি। তিনি কোথায় ছিলেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মহিদুল বলেন, তাকে জ্বিনে নিয়ে গিয়েছিল; জ্বিনের আশ্রয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, মহিদুল ওই আসামীদের টাকা আত্মসাৎ করে নিজে থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন। তাছাড়া, মহিদুল এক পর্যায়ে স্বীকার করেন যে, রিপন ও হাশেম শেখের মামলার তদবির করার জন্য তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।  

জেলা শিক্ষা অফিসে মুচলেকা দিয়ে চাকরিতে যোগদান করে মহিদুল

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: শাহআলম জানান, দীর্ঘ ৩ মাস ৯ দিনের মতো মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৩৬ নং পশ্চিম গাজিরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মহিদুল গাজী কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় আমরা তাকে শোকজ করি। জবাবে মহিদুল কখনও জ্বিনে নিয়ে গিয়েছে বলে উদ্ভোট কথা আবার কখনও বলে অসুস্থ ছিলেন।

তিনি জানান, অসুস্থ থাকলেও তিনি অসুস্থতার কোনও সনদ দেখাতে পারেননি। পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিয়ে অঙ্গিকার করেন যে, ভবিষ্যতে মহিদুল আর এমন কাজ করবেন না-এমন শর্তে তিনি আবার কর্মস্থলে ফেরেন।

এছাড়াও মহিদুল স্কুলের নির্ধারিত সময় না মেনে তার নিজ ইচ্ছায় স্কুলে আসা-যাওয়া করতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেশ কয়েকবার তাকে সতর্ক করে। সতর্ক পরবর্তী মহিদুল বেশ কয়েকবার অঙ্গিকারনামাও প্রদান করে। নাগরিক পত্রিকার হাতে আসা এমন একটি অঙ্গিকারনামায় মহিদুল অঙ্গিকার করেন যে, ‘‘আমি মো: মহিদুল ইসলাম পিতা: সেকেন্দার আলী সহকারি শিক্ষক ১৩৬ নং পশ্চিম গাজীরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মোড়েলগঞ্জ, বাগেরহাট। এই মর্মে অঙ্গিকার করিতেছি যে, আমি পরবর্তীতে কখনও আমার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি ব্যতিত বিদ্যালয় ত্যাগ করিব না ’’।  যা গত বছরের জুলাই মাসের।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মহিদুল গাজীর মোবাইলে একাধিকার ফোন করা হলেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তার কোনও বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।