নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৩-০২-১৯ , ০৩:১১ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
১৫ ফেব্রুয়ারি। নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল আদালত বাগেরহাট-২। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ধারার একটি মামলায় রায় ঘোষণা করবেন আদালত। আদালতের ডকে উপস্থিত, ওই মামলার অভিযুক্ত দুই জন। ডকের বাইরে কালো কোট পরিধানে পায়চারী করছিল মহিদুল ইসলাম। মামলা থেকে খালাস করিয়ে দিবেন বলে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল মহিদুলের সাথে ওই দুই আসামীর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ট্রাইব্যুনাল মামলাটিতে রিপন শেখ এবং হাশেম শেখকে যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করেন। আর সেই রায় ঘোষণার মুহুর্তেই আদালত প্রাঙ্গন থেকে সটকে পড়েন মহিদুল ইসলাম।
মহিদুল বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৩৬ নাম্বার পশ্চিম গাজিরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি একই এলাকার সেকেন্দার আলীর ছেলে।
ঘটনার কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও বাড়ি ফিরছেন না স্কুল শিক্ষক মহিদুল। পরিবার স্বজনরা উদ্বিগ্ন। মহিদুল নিখোঁজ উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরীও করেন তার স্ত্রী মৌসুমি আক্তার। মহিদুলের ভাই ওহিদুল (মেম্বার) কয়েকটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন আসামীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মহিদুল কাজ করতে না পারায় মহিদুলকে আসামীর স্বজনরা আটকে রেখেছেন। মহিদুল টাকা ফেরত দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও পুলিশকে জানায় ওহিদুল মেম্বার।
ভাইকে উদ্ধারে র্যাব-৬’এ একটি আবেদনও করেন ওহিদুল। দেশের প্রথম সারির সকল গণমাধ্যমে স্কুল শিক্ষক মহিদুলের নিখোঁজের সংবাদ ছাপছে গুরুত্ব সহকারে। আসল ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত শুরু করলো পুলিশ ও র্যাবের একটি দল। স্বামীকে উদ্ধারে মহিদুলের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে মানববন্ধনও করেছেন তার স্ত্রী মৌসুমি আক্তার। কিন্তু কোনও হদিস মিলছে না মহিদুলের।
রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের পরিবারের এক সদস্য জানান, একটি পারিবারিক মামলায় দেবরাজ এলাকার দুই বাসিন্দা ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত আদালতে আসা যাওয়া করতো। প্রায় বছর খানেক আগে বাগেরহাট আদালত এলাকায় মহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয় তাদের। মহিদুল ওই আসামীদের কাছে নিজেকে সাবেক একজন আইনজীবী এবং নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের বিচারক নূরে আলম তার ঘনিষ্ট বন্ধু পরিচয় দিয়ে ওই আসামীদের মামলা সম্পর্কে জানতে চায়। পরে আসামী এবং মহিদুলের বিভিন্ন আলাপচারিতায় তাদের বাড়িও একই উপজেলায় জানতে পেরে মহিদুল আসামীদের মামলা থেকে খালাস করে দিবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
আসামীর উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবারে ওই সদস্য জানান, মহিদুল আসামীদের মামলা থেকে খালাস করিয়ে দিবেন বলে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকায় একটি মৌখিক চুক্তি হয়। চুক্তির পর প্রথম দফায় মহিদুল আসামীদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেন। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি, রায়ের দিন আরও ৫৫ হাজার টাকা নেন। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের বিচারক (নূরে আলম) বদলীর কারণে তার সাথে চট্টগ্রাম গিয়ে দেখা করার কথা বলেও গাড়ি ভাড়া নেন মহিদুল। পরে নতুন বিচারক যোগদান করলে ওই বিচারকের সাথে মামলা নিয়ে আলোচনা করবে বলে মহিদুল বিচারকের বাসায় যেতে যেতেও নেয় আরও পাঁচ হাজার টাকা।
আসামীদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, মহিদুলের অভিনব প্রতারণা কেউ বুঝতে পারেনি। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সাথে বাসায় গিয়ে কথা বলবে বলে আসামীদের একদিন ওই বিচারকের বাসার সামনে দাঁড় করিয়ে মহিদুল ওই বিচারকের বাসার গেইটের ভিতরে প্রবেশ করে। কিন্তু ধূর্ত মহিদুল ওই বিচারকের বাসার গেইট দিয়ে প্রবেশ করে বাসার দাড়োয়ানের সাথে কিছুক্ষন কথা বলে বের হয়ে আসে এবং রিপন শেখকে মহিদুল বিশ্বাস স্থাপন করায় যে, তিনি বিচারকের সাথে দেখা করে মামলার খালাসের বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলে এসেছেন।
তিনি আরও বলেন, মহিদুল নিখোঁজ হওয়ার পর ‘আমি তার এলাকায় খোঁজ-খবর নিতে শুরু করি। মহিদুল তার এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নানান অযুহাতে টাকা ধার নিতেন। কয়েকটি এনজিও থেকে লোন নিয়েছেন। এসব টাকা ফেরত দিতে না পেরে মহিদুল নিজ থেকে আত্মগোপনে গিয়ে আমাদের ফাঁসাতে চেয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে প্রায় ১ ডজন। শোনা যায়, মহিদুল এর আগেও একাধিকবার মানুষের টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন।
এছাড়া মহিদুল কখনও সেনাবাহিনীর ক্যাপ (টুপি) ব্যবহার করে নিজেকে সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। নিজেকে কখনও আইনজীবী পরিচয় দিতেন কখনও বিচারকের বন্ধু বা আত্মীয়। তিনি বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে আদালত প্রাঙ্গনে ঘুরতেন এবং অসহায় বিচারপ্রার্থীদের টার্গেট করতেন। মহিদুলের এসব অপকর্মের বিষয়ে তার ভাই ওহিদুল মেম্বার তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন বলেও জানান তিনি।
অভিযুক্তদের পরিবারের ওই সদস্য আরও জানান যে, মহিদুল ও ওহিদুল দুই ভাইসহ আরও কয়েকজন মিলে একটি সিন্ডিকেট করে এসব প্রতারণা করে। তারা র্যাব পরিচয়ে আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ০১৬৩০১৮XX৭২ মোবাইল নাম্বার থেকে র্যাব পরিচয়ে হুমকি প্রদান করলে র্যাব ৬ এর কোম্পানী কমান্ডার মো: বদরুদ্দোজাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, মহিদুল ইসলাম একজন প্রতারক। তিনি বিভিন্ন এনজিও এবং এলাকার মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে মাঝে মাঝে আত্মগোপনে চলে যায় মহিদুল। তার ভাই ওহিদুল মেম্বার তাকে সহায়তা করে।
স্থানীয়রা আরও জানান, ওহিদুলের বাপ-চাচারও এলাকায় এভাবে এক-একটি অঘটন ঘটিয়ে আত্মগোপনে চলে যেত। কিছু দিন আগে দেবরাজ গ্রামের দুই জনকে হত্যা মামলা থেকে খালাস নিয়ে দিবে বলে মহিদুল মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে পলাতক হয়। মহিদুল কখনও নিজেকে আইনজীবী কখনও সেনা সদস্য পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করেন বলেও জানান স্থানীয়রা।
বিষয়ে অভিযুক্ত মহিদুল ইসলাম ওরফে মহিদুল গাজীর বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে কল করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে বাগেরহাট সদর থানায় উপ পুলিশ পরিদর্শক শাহিন জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মো: মহিদুল ইসলাম নামে মোড়েলগঞ্জ উপজেলার একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিখোঁজ হয়েছেন বলে তার স্ত্রী মৌসুমি আক্তার সাধারণ ডায়েরী করেন। এসআই শাহিন জানান, স্কুল শিক্ষক নিখোঁজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে মহিদুলের ভাই ওহিদুল মেম্বারের সাথে কথা বলি।
তিনি জানান, একই উপজেলার রিপন শেখ ও হাশেম শেখ নামে দুই ব্যক্তির একটি মামলায় তদবির করতে গিয়ে বাগেরহাট আদালতে এলাকা থেকে মহিদুল সেদিন থেকে নিখোঁজ। ওহিদুল দাবি করেন- মামলার আসামী পক্ষের লোকজন তার ভাইকে টাকা ফেরত দেওয়ার দাবিতে আটকে রেখেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি তদন্ত করলে ওহিদুলের দাবির কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.