স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন: নির্মল-সাচ্চু এগিয়ে; লিয়াকত ইস্যুতে টিপুকে ‘না’

 সিটিজেন নিউজ ডেস্ক
আপডেট: ২০১৯-১১-০৬ , ০৪:২৮ পিএম

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন: নির্মল-সাচ্চু এগিয়ে; লিয়াকত ইস্যুতে টিপুকে ‘না’ ছবি: ইন্টারনেট

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন ২০১৯। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লিন ইমেজ ও রাজনীতিতে দীর্ঘ পথপরিক্রমা রয়েছে এমন নেতাদের স্বেচ্ছাসেবক লীগের দায়িত্ব দেয়া হবে বলে দলের শীর্ষ নেতাদের ধারনা। ক্যাসিনো ব্যবসায়ী, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িতদের বাদ দেয়া হবে বলে জানা যায়। 

দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ‌ সাত বছর ধরে সম্মেলন না হওয়ায় নেতাকর্মীরা ঝি‌মিয়ে পড়েছে। ক্যসিনোকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউসারে নাম আসায় ইতিমধ্যে তাকে অব্যহতি দেওয়া হয়। তাই ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে নতুন নেতৃত্বের সন্ধান শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। এতে সার্বিক সহযোগিতা করছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। ফলে সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে পারেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতাকর্মীরা।

একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে আসন্ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি প্রার্থী পদে নির্মল রঞ্জন গুহ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে গাজী মেজবাহুল হক সাচ্চু এগিয়ে আছেন।

সম্মেলনের মাধ্যমে সৎ, ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মীদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব বাছাই করা হবে বলে জানান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তারা বলেন, দলের জন্য যারা নিবেদিত, দলের প্রতি আনুগত্য, শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল এমন লোকদের থেকেই নেতৃত্ব আসবে।

এ বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি এবং সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহবায়ক নির্মল রঞ্জন গুহ সিটিজেন নিউজকে বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ আমার প্রাণের সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সুচনালগ্ন থেকেই আমি ছিলাম এবং আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে আসছি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের  দুঃসময়ে যাদের ভূমিকা ছিল এমন রাজপথের ত্যাগী এবং ক্লিন ইমেজের নেতারাই আসবে মুল নেতৃত্বে। বিতর্কিত কারও কমিটিতে আসার সুযোগ নেই । তবে এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য সচিব গাজী মেজবাহুল হক সাচ্চু সিটিজেন নিউজকে বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ একটি পরিচ্ছন্ন সংগঠন। নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। যাদের বিরুদ্ধে কোনও বিতর্ক নেই এবং যাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন নেতৃ‌ত্বই আসবে আশা করছি ।  

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিতর্কিত সাবেক সভাপতি সোহেল রানা টিপু স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারের ক্যাডার খ্যাত এই টিপু সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিতে ধর্ণাও দিচ্ছে বিভিন্ন মহলে। নানান অভিযোগে অভিযুক্ত টিপু স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়ার খবরে ক্লিন ইমেজের নেতাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- টিপুর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়েও।

কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল একটি দল। তারা মনে করেন- এমন গুরুত্বপূর্ণ দলের দায়িত্ব অবশ্যই ক্লিন ইমেজ ও যোগ্যতা সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হাতে দেয়া উচিত। নয়তো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ডিজিটাল সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় নানান বিতর্ক ও ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে।

সূত্রে জানা যায়,শেখ সোহেল রানা টিপু বর্তমানে স্বেচ্ছা সেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এক সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন লিয়াকত শিকদারের ক্যাডার হিসেবে। লিয়াকত শিকদারই তাকে ওই পদে বসিয়েছিলেন। এখনও পরক্ষভাবে তার পক্ষে মাঠে নেমেছেন লিয়াকত শিকদার।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি থাকাকালীন নানান অভিযোগ ওঠে শেখ সোহেল রানা টিপুর বিরুদ্ধে। ওই সময়ে তিনি অস্ত্র মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে তৎকালীন একাধিক জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট অস্ত্র ও ফেনসিডলসহ রাজবাড়ির পাংশা থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন টিপুর ছোট ভাই ইমন। সে সময়ে রিমান্ডে টিপুর ভাই ইমন স্বীকার করেন, ইমন তার ভাই শেখ সোহেল রানা টিপুর ছত্রচ্ছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অস্ত্র  মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন। এ নিয়ে ওই সময়ে টিপুকে নিয়ে বিব্রত অবস্থায় পড়ে ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

এছাড়াও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের এক একজন ছাত্রী সঙ্গে দীর্ঘদিন লিভটুগেদার করার অভিযোগও রয়েছে টিপুর বিরুদ্ধে। ওই ছাত্রীর বাড়ি টিপুর নিজ এলাকা পাংশা উপজেলায়। বিয়ের আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত ওই মেয়েকে তিনি বিয়ে করেননি। পরে ওই ছাত্রী ঘটনাটি জানানোর জন্য একাধিকবার আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে যেতে চাইলেও লিয়াকত সিন্ডিকেটের কারণে পৌছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত হালছেড়ে ওই ছাত্রী নিজ এলাকায় চলে যান।

অভিযোগ রয়েছে, টিপু বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি থাকালীন সময়ে ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান টুকুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবশ করিয়ে দেয়ার কথা বলে তারেক জিয়ার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা নেয়। টিপুর কথা মোতাবেক টুকু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীরা তাকে প্রতিহত করে। পরে টিপু বাধ্য হয়ে তারেক জিয়ার কাছে ৮ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে আসে।

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টম্বর টিপুর বহিরাগত ক্যাডার রাজবাড়ির কালা সোহেল পাকিস্তানের তৈরি একটি বন্দুক নিয়ে ধরা পড়ে। পুলিশের কাছে সে স্বীকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিমউদ্দিন হলে টিপুর রুমে থেকেই সে অস্ত্র ব্যবসা করে।

শেখ সোহেল রানা টিপু বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন নিউজকে বলেন,‘আমি এখন পার্টি অফিসে আছি। আপনি একটু আমার সাথে দেখা করলে ভালো হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় একসাথে বসলে সব সমাধন হয়ে যাবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে এসব মিথ্যা বলে জানান তিনি।   

শেখ সোহেল রানার সাথে সিটিজেন নিউজের ফোন আলাপ শেষে বিভিন্ন নাম্বার থেকে সিটিজেন নিউজের টিএনটি নাম্বারে কল দিয়ে ধমকের সুরে পরিচয় জানতে চান অনেকে।

উ‌ল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের তৎকালীন সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনকে আহ্বায়ক করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রথম কমিটি হয়। পরে ২০০২ সালে প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন বাহাউদ্দিন নাছিম, সাধারণ সম্পাদক হন পঙ্কজ দেব নাথ।

সর্বশেষ, ২০১২ সালে মোল্লা মো. আবু কাওছারকে সভাপতি এবং পঙ্কজ দেবনাথকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি হয়েছিল। মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও ওই কমিটিই এখনও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কাসিনোকাণ্ডে নাম এসেছে  মোল্লা আবু কাউসারের ও। দলের মধ্যে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের কারণে এবারের কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আসবে বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।