মানছে না জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা

১ কোটি ৫ লাখ টাকায় বিক্রি রৌফাবাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ২টি প্লট

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৯-২৪ , ০২:২২ পিএম

১ কোটি ৫ লাখ টাকায় বিক্রি রৌফাবাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ২টি প্লট ছবি: নাগরিক পত্রিকা

জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের (মোহাজের সম্পত্তি) জায়গা বিক্রি এবং বহুতল ভবন নির্মানে যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কিছু অসাধু উর্দুভাষী-বাঙালীরা। কিছুতেই যেন থামছে না তারা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কয়েকদিন পরই চূড়ান্ত পদক্ষেপের ঠিক আগমুহূর্তে কার্যক্রম থেমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বেদখল হওয়া জায়গা উদ্ধারে সাবেক এডহক কমিটি এবং কয়েকজন উর্দুভাষী নিজ উদ্যোগে জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একাধিক অভিযোগ করেন। শুরু হয় তদন্ত; তদন্তে অভিযোগের সত্যতাও মেলে। অভিযুক্ত ও ভূমি দখলকারীদের সরকারি জায়গা ছেড়ে দিতে নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্ছেদের চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে হঠাৎ করেই যেন সবকিছু থমকে যায়।

যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উচ্ছেদ পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেটিই শেষ মুহূর্তে গিয়ে থেমে যায়—উঠে আসে প্রশ্ন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলার পরও কেন কার্যকর হচ্ছে না উচ্ছেদ? কার প্রভাব বা হস্তক্ষেপে বারবার থমকে যাচ্ছে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ?

নাগরিক পত্রিকা সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদ এলাকার বেদখল হওয়া জায়গা, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বরাদ্দকৃত জায়গা অন্যের কাছে বিক্রির বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য তুলে ধরে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ওইসব প্রতিবেদনের আলোকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো: মাসুদুর রহমান ও এবং সহকারী ভূমি কমিশনার আলআমিনকে (চান্দগাঁও) ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

‘‘রৌফবাদে উর্দুভাষীদের জমি ক্রয়-বিক্রিয় যেন থামছেই না’’- এই শিরোনামে গত ১৩ আগস্ট প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা প্রশাসক সহকারী ভূমি কমিশনার (চান্দগাঁও) ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। সহকারী ভূমি কমিশনার তার দপ্তর থেকে তদন্ত করে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা পান। এ ঘটনার পরপরই জায়গাটি লক্ষীপুরের দুই বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা ১ কোটি ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে চলে যান চার উর্দুভাষী কাছে। তারা হলেন, সাগর, সাবা, শিপলু এবং রহিমা।

সহকারী ভূমি কমিশনার আলআমিন নাগরিক পত্রিকাকে জানান, এ ঘটনায় ইতিমধ্যে একটি প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক মহোদয়কে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে যে নির্দেশনা আসবে- সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সহকারী ভূমি কমিশনার।

তিনি বলেন, জায়গাটি যার নামে বরাদ্দ (এলোটমেন্ট) হয়েছিল তিনি বা তাদের ওয়ারিশগণ থাকতে পারবেন। এখানে বিক্রি করার ঘটনা ঘটেছে সেহেতু তাদের সরিয়ে/উচ্ছেদ করে সরকারের মূল খতিয়ানে জায়গাটি অন্তর্ভূক্ত করা হবে।

তবে, সম্প্রতি জায়গাটি ক্রয় করার পর ক্রেতারা প্রকাশ্যে এলাকায় বলছেন, ‘সবাইকে ম্যানেজ করা হয়ে গেছে। এখানে আর কেউ আসবে না।’ তাদের এমন কথার সত্যতা স্বাধীনভাবে নাগরিক পত্রিকা যাচাই করতে পারেনি। কারণ তাদের ভয়ে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চায় না।

‘‘রৌফাবাদে রাস্তার ওপরেই ভবন নির্মাণ: বললেন ডিআরআরও’র অনুমোতি আছে’’- শিরোনামে ৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সহকারী ভূমি কমিশনার চান্দগাঁও কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) দৃষ্টিগোচর হলে সরেজমিনে তদন্ত করে রাস্তার ওপর ভবন নির্মাণের সত্যতা পায়। এরপর চসিক ভবনটির ছাদ ভেঙে ফেলতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধক্রমে একটি চিঠি পাঠায় বলে নিশ্চিত করেন চসিকের চীফ অ্যাস্টেট অফিসার।

‘‘রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সাইনবোর্ড খুলে জায়গা দখল ভূমিদস্যু রনিং গংয়ের’’- শিরোনামে গত ২৯ আগস্ট তৃতীয় প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সহকারী ভূমি কমিশনার চান্দগাঁও অবৈধ ভূমি দখলদার ইকবাল হোসেন রনিকে ডেকে সরকারের ওই জায়গা খালি করে দিতে নির্দেশ দেন। এ ঘটনার সত্যতা পেয়ে পিডিবি দু’টি অবৈধ মিটার এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে সংযোগ বিচ্ছন্ন করে। 

পত্রিকায় প্রকাশিত ওই জায়গাটি নিয়ে এর আগে রৌফাবাদের এডহক কমিটি এবং কয়েকজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে দখলীয় জায়গা উচ্ছেদে জেলা প্রশাসকসহ ঢাকার সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাধিক অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্তে আসে; ঘটনার সত্যতাও পায়। কিন্তু অজ্ঞাত-অজানা কারণে উচ্ছেদের চূড়ান্ত পর্যায়ের আগেই সব থেমে যায়।

সূত্র জানায়, ওই জায়গাটি ২০১৭ সালে ইকবাল হোসেন রনি দখল করে সেখানে একটি অটো রিকশার গ্যারেজ এবং বেশ কয়েকটি দোকান নির্মাণ করেন। জায়গাটি উদ্ধারে দীর্ঘ ৯ বছরের বহু অভিযোগ করা হয়েছে। উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ের আগেই সব থেমে যাওয়ার কারণ জানেন না স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, কতিপয় সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করার কারণে কোনও উচ্ছেদই সফল হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ভূমিকা বা কী ধরনের নির্দেশনা আছে- তা জানতে কথা হয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সাইফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, এসব জমি উদ্ধারে মাননীয় মন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতো কিছুর পরও কেন জমি উদ্ধার করতে গড়িমসি করছে বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখা হবে। একইসাথে এ ঘটনায় যদি সরকারের অসাধু কোন ব্যক্তি জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ঘটনাগুলোর সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে কথা হয় সহকারী ভূমি কমিশনার (এসিল্যান্ড চান্দগাঁও) আলআমিনের সাথে। তিনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, জাফর নামে এক ব্যক্তির করা দ্বিতল ভবনের কাজ বন্ধ করা হয়েছে। ১২৬৯, ১২৭০, ১২৭১ নং হোল্ডিংয়ের জায়গাটি বিক্রির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক মহোদয়কে পাঠনো হয়েছে এবং ইকবাল হোসেন রনি নামে যে ব্যক্তি সরকারের সাইনবোর্ডসহ জায়গাটি দখল করে রেখেছে তিনি কয়েকদিন সময় নিয়েছেন তার দোকান-পাট সরিয়ে নিতে।

সহকারী ভূমি কমিশনার বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে না নিলে উচ্ছেদ করা হবে।  

এ সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

রৌফবাদে উর্দুভাষীদের জমি ক্রয়-বিক্রিয় যেন থামছেই না