পুলিশের গুলিতে সাবেক মেজর নিহত

‘আমি হতবাক, শোকে বাকরুদ্ধ…’

 কক্সবাজার প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২০-০৮-০২ , ০৯:৫৮ এএম

‘আমি হতবাক, শোকে বাকরুদ্ধ…’ ছবি: সিটিজেন নিউজ

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনা কিছুতেই মানতে পারছে না তার বন্ধু মহল। গুলিতে মৃত্যুর পর পুলিশের বক্তব্য হতাশ করেছে সিনহার পরিবার-আত্মীয়স্বজনসহ বন্ধু-বান্ধবদের।

তাদের অনেকে বলছে, পুলিশের চেকপোষ্টে তল্লাশীর সময় সিনহা পিস্তল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়-পুলিশের এমন বক্তব্য মনগড়া। এছাড়া সিনহার গা‌ড়ি‌তে তল্লাশি ক‌রে ৫০টি ইয়াবা, কিছু গাঁজা এবং দুটি বি‌দেশি ম‌দের বোতল উদ্ধার করা হ‌য়ে‌ছে- পুলিশের এমন বক্তব্যে তারা সবাই হতাশ।

তানভীর অপু নামের একজন তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি হতবাক, শোকে বাকরুদ্ধ। যে উচ্ছল মানুষটি শুধু ভ্রমণ করার জন্য, দুনিয়া দেখার জন্য সেনাবাহিনীর মেজরের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে জীবনে চলতে চেয়েছিলেন নিজ পথে, তাকে এভাবে হত্যা করা হলো।

সাবেক এসএসএফ  অফিসার, কমান্ডো ট্রেনিং পাওয়া আমাদের এত কাছের বন্ধুটা এত ভালো মানুষ ছিলো, আর তাকে নিয়ে এখন এত রটনা -

১. মেজর (অব:) রাশেদ uniform নয় বরং ছিলেন combat কালার T- shirt প্যান্টে এ

২. তার কাছে তার লাইসেন্স পিস্তল ছিলো।

৩. তিনি ইউটিউবে একটা show একটা শুটিং এ সেখানে ছিলেন।

৪. নিজের পরিচয় retired major দেবার পর তিনি গাড়ি থেকে নামেন। এবং তখন আগে থেকেই উপস্থিত ইন্সপেক্টর লিয়াকত গুলি চালান, যেটা প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন সংস্থা জেনেছে।

৫. এর আগে পাহাড়ে শুটিংয়ের সময়ে স্থানীয় তিন / চার জনের সাথে তিনি সাউট করে চলে যেতে বলেন।

এই ঘটনার পিছনে সত্য উদঘাটন হোক।’

জানা যায়, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে টেকনাফের বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে সিনহা রাশেদ খান নিহত হন।

এ ব্যাপারে জেলা পু‌লিশ জা‌নি‌য়ে‌ছে, সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত গা‌ড়ি‌তে ক‌রে অপর একজন স‌ঙ্গীসহ টেকনাফ থে‌কে কক্সবাজার আস‌ছি‌লেন। মে‌রিন ড্রাইভ সড়‌কের বাহারছড়া চেক‌পো‌স্টে পু‌লিশ গা‌ড়ি‌টি থা‌মি‌য়ে তল্লাশি কর‌তে চাইলে সেনা কর্মকর্তা বাধা দেন। এই নি‌য়ে তর্ক-বিত‌র্কের একপর্যা‌য়ে সেনা কর্মকর্তা তার কা‌ছে থাকা পিস্তল বের কর‌লে পুলিশ গু‌লি চালায়। এতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান গুরুতর আহত হন। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতা‌লে নি‌য়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা ক‌রেন। শ‌নিবার সকা‌লে নিহ‌তের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হ‌য়ে‌ছে।

কক্সবাজা‌রের পু‌লিশ সুপার এবিএম মাসুদ হো‌সেন জা‌নি‌য়ে‌ছেন, শামলাপু‌রের লোকজন ওই গা‌ড়ির আরোহীদের ডাকাত স‌ন্দেহ ক‌রে পু‌লিশকে খবর দেয়। এই সম‌য়ে পু‌লিশ চেক‌পো‌স্টে গা‌ড়ি‌টি থামা‌নোর চেষ্টা ক‌রে। কিন্তু গা‌ড়ির আরোহী একজন তার পিস্তল বের ক‌রে পু‌লিশ‌কে গু‌লি করার চেষ্টা ক‌রে। আত্মরক্ষা‌র্থে পু‌লিশ গু‌লি চালায়। এতে ওই ব্য‌ক্তি মারা যান।

পুলিশ সুপার জানান, এই ঘটনায় দু‌টি মামলা হ‌য়ে‌ছে। দুজনকে আটক করা হ‌য়ে‌ছে। পু‌লিশ পিস্তল‌টি জব্দ ক‌রে‌ছে। এ ছাড়া গা‌ড়ি‌তে তল্লাশি ক‌রে ৫০টি ইয়াবা, কিছু গাঁজা এবং দুটি বি‌দেশি ম‌দের বোতল উদ্ধার করা হ‌য়ে‌ছে।

এদিকে, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুতে তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আজ শনিবার (২ আগষ্ট) সন্ধ্যায় এই কমিটি গঠন করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহে এলিদ মাইনুল আমিন স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় বলা হয়, তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. শাজাহান আলি। অন্য দুই সদস্য হলেন কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার মনোনীত একজন  অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের একজন প্রতিনিধি। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের ভেতরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, কমিটি ঘটনার বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ, উৎস অনুসন্ধান করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় ইত্যাদি সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ পূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ মতামত দেবে।

উল্লেখ্য, মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা রাশেদ খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপসচিব মো. এরশাদ খানের ছেলে। তিনি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করেন। তিনি গত ৩ জুলাই ঢাকা থেকে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের তিনজন ছাত্রছাত্রীসহ একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য একটি ট্রাভেল ভিডিও তৈরি করতে কক্সবাজার আসেন। প্রায় এক মাস যাবত তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেন।

এদিকে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তার রাজউক কলেজের বন্ধুরা। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।