মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেওয়ায় খুন হলেন মোসাদ্দেকুর

 এ. কে. আজাদ (লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি )
আপডেট: ২০২০-০৬-২৩ , ০৮:৩৬ এএম

মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেওয়ায় খুন হলেন মোসাদ্দেকুর ছবি: সিটিজেন নিউজ

এলাকা থেকে ইয়াবা নির্মূলের ঘোষণা দেয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুন হন মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেওয়া মোসাদ্দেকুর রহমান (৩৭)। মাদক নির্মূলের ঘোষণাই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল মোসাদ্দেকের জীবনের। সোমবার (২২) জুন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বারদোনা গ্রামের আদর্শ পাড়ায় ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় তাকে।

স্থানীয়রা বলছেন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে মোসাদ্দেকুর প্রতিবাদ করায় স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সোহেল তাকে ছুরিকাঘাতে খুন করে।

নিহত মোসাদ্দেকুর রহমান আদর্শ পাড়ার মাহবুবুর রহমানের ছেলে।

তিনি চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দিন বাজারের মক্কা হোটেলের পরিচালক। এ ছাড়াও তিনি সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের বারদোনা মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন।

এদিকে, মোসাদ্দেক খুনের ঘটনার পর থেকেই ইয়াবা ব্যবসায়ী সোহেল পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে, পুলিশ সোহেলকে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান সাতকানিয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সফিউল কবীর।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় নিজে উদ্যোগী হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের বারদোনা মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন মোসাদ্দেকুর রহমান। এলাকাবাসী ওই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বও দেন তাকে ।

করোনা পরিস্থিতি শুরু থেকেই তিনি এলাকায় এসে এ কমিটির কর্মকাণ্ডকে আরও জোরদার করে তোলেন। এরই ধারাবাহিকায় গত শনিবার বিকেলে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের বাড়িতে কমিটির লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

বৈঠকের পর ছবি দিয়ে মোসাদ্দেকুর তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, 'প্রতিটি সমাজ থেকে ইয়াবা নির্মূল করার পাশপাশি ক্রমান্বয়ে ১৬ নম্বর সদর ইউনিয়নকে ইয়াবামুক্ত করতে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব হারুনুর রশিদ, পরানেরপাড়ার কৃতি সন্তান লুৎফর রহমান, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অভিভাবক সেলিম উদ্দিন এবং চিববাড়ীর ডাক্তার পাড়ার হেলাল উদ্দিনকে নিয়ে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করি। পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যকলাপ আরও সম্প্রসারিত করা হবে।'

ফেসবুকে তার এমন ঘোষণার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সোমবার (২২ জুন) বিকেলে আসর নামাজের পর মোসাদ্দেকুর এলাকার হাঁটতে বের হন। হাঁটতে হাঁটতে ইয়াবা ব্যবসায়ী সোহেলের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সোহেল মোসাদ্দেককে দেখামাত্রই তার নাম ধরে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করে। মোসাদ্দেক গালিগালাজের কারণ জানতে চাইলে তাদের মধ্য বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সোহেল অতর্কিতভাবে মোসাদ্দেককে ছুরিকাঘাত করলে সে গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এসময় মোসাদ্দেকের আত্নচিৎকারে ঘটনাস্থলের পাশেই খেলতে থাকা মোসাদ্দেকের ছোট ভাই ফয়সালসহ (৩৫) বেশ কয়েকজন যুবক এগিয়ে আসলে ফয়সালকেও ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায় সোহেল।

পরে স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে প্রথমে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য দুজনকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠান। পরে চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোসাদ্দেককে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ব্যাপারে সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘মোছাদ্দেক মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আমরা মাদকবিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার করার জন্য গত শনিবার আসরের নামাজের পর একটি বৈঠক করি। মাদকবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই মোসাদ্দেককে হত্যা করা হয়েছে বলে আমি মনে করছি।’

স্থানীয় যুবলীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন বলেন, সোহেলের সাথে প্রায় ৫০ জনের একটা ইয়াবা সিন্ডিকেট আছে। যুবলীগ নেতা মোসাদ্দেকসহ আমরা যখন মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই তখন সোহেল ও তার অনুসারীরা আমাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করে। ওই মামলায় আমাদের রাশেদ, ইদ্রিস, নাজিম, আমিন কারাভোগ করে। পরে ওই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআইকে।

স্থানীয় সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘মোসাদ্দেক এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি এলাকায় মাদক বিরোধী কমিটিও গঠন করেছেন।’

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দীন বলেন, ‘মোসাদ্দেকুর রহমান যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। দলে কোন পদ-পদবি না থাকলেও বিগত কয়েক মাস মাদকের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে প্রচুর কাজ করেছেন তিনি।’

প্রসঙ্গত, সোহেল কিছুদিন আগে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগায়ে যায়। ঈদের পর কারামুক্ত হয়ে সোহেল আবারও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সোহেল স্থানীয় মোহাম্মদ আলীর ছেলে। দীর্ঘদিন যাবৎ সোহেল ইয়াবা ব্যবসা করে যাচ্ছে। এছাড়াও এলাকার কয়েকটি কিশোর গ্যাং পরিচালনাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে সোহেল।