ওসি মোয়াজ্জেমের ক্ষমতা নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অক্ষমতা?

 রোমান শেখ
আপডেট: ২০১৯-০৬-১২ , ০১:৫১ পিএম

ওসি মোয়াজ্জেমের ক্ষমতা নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অক্ষমতা?

বহুবার কথার কথা শুনেছি। কথাটি হলো-‘রাশিয়ান পরাশক্তি!’ ক্ষমতার কথা নিয়ে কেউ আলোচনা, সমালোচনা করলে মজা করে হোক আর সিরিয়াস হোক, এমনটাই বলতে শোনা যায়।এই কথায় সোজা-সাপ্টা আর ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে অর্থ বোঝালে অন্তত সবচেয়ে শক্তিশালী বা ক্ষমতাশালীকেই বুঝায়। আমার এমন কথায় কেউ আবার ভ্রু কুচিয়ে নিতে পারেন। বলতে পারেন-ভাবতে পারেন, আমাদের দেশ কি শক্তিশালী বা ক্ষমতাশীল নয়?

যিনি ভ্রু কুচিয়ে নিয়ে এমন প্রশ্ন করেছেন, উত্তরটা সোজা এবং তার পক্ষেই। তবে, শক্তি বা ক্ষমতার বিষয়টা আরেকটু ছোট পরিসরে রাখতে চাই। দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমসাময়িক বিষয় বা প্রেক্ষপটে পুলিশের ওসিদের ক্ষমতা সম্পর্কে সবারই কম-বেশি ধারণা আছে। সন্ত্রাস দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যেমন তাদের রাষ্ট্রিয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান রয়েছে তেমনি গুটি কয়েক পুলিশ সদস্যর কারণে পড়তে হয়েছে নানান সমালোচনার মুখে। পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্টে ওইসব গুটি কয়েক সদস্যই যথেষ্ট কিনা সেটা বিশ্লেষণ আর বিচারের দায় জনসাধারণের।

একজন সাবেক ‍ওসি মোয়াজ্জেম ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যার পর থেকে আলোচিত একজন খলনায়ক হয়েছেন সর্বস্তরে! বিভিন্ন গণমাধ্যেমের তথ্যানুযায়ী মোয়াজ্জেমের অতীত রেকর্ডও তেমন ইতিবাচক ছিলো না। নানাভাবে নিরহ মানুষকে হয়রানী করছে। দেখিয়েছে তার ওসিগীরীর ক্ষমতাও! সেদিনের লজ্জিত নুসরাতকে কিছু প্রশ্ন করেছিলো নির্লজ্জের মতো। লজ্জায় নুসরাত মুখে হাত চেপে কান্না করে বলছিলো-কী হয়েছিলো তার সাথে। মোয়াজ্জেম একাধিকবার তার হাত নামিয়ে নিতে বলে। কিন্তু নুসরাতের সাথে অতীতে যা ঘটেছিলো সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গিয়ে ওসির কথায়ও তার লজ্জা ভাঙ্গেনি। লজ্জার মুখে হাত রয়েই গেলো!

অভিযোগ ওঠে, সেদিন ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাতকে আইনি সহায়তা দেয়নি। যদি দিতো তাহলে হয়তো যৌন হেনস্থার জন্য দায়িদের শাস্তিসহ ওই ঘটনার ইতি টেনে ভবিষ্যতের জন্য একটা শক্ত ম্যাসেজ দিয়ে যেতে পারতো।জয় হতো নুসরাতদের।

কিন্তু সেসবের কিছুই হয়নি। ‍ওসি মোয়াজ্জেম নাকি খুব ক্ষমতাবান ছিলেন। কিন্তু নুসরাত ঘটানায় আলোচনা, সমালোচনা, তোপ আর ভিকটিমকে সহযোগিতা না করার দায়ে তাকে বদলি করা হয়েছিলো রংপুরে। বদলির পর থেকে খারাপ যাচ্ছিলো না তার দিনকাল। তারপরও বিধি বাম!

হঠাৎ এক ব্যারিষ্টার ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা একটা ঠুকে দেয় আইসিটি এ্যাক্টে। তদন্ত দিলো পিবিআইকে। স্পর্শকাতর বিষয় দেখে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। সেই ব্যারিষ্টারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে পিবিআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়। মানে হলো-ওসি মোয়াজ্জেম অপরাধ করছে! মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো।

গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো না যেনো, ওসি মোয়াজ্জেমের ক্ষমতা বেড়িই চললো! পালিয়ে গেলো নাকি পালিয়ে বেড়াচ্ছে? ওহহ, প্রশ্ন করতে পারেন মোয়াজ্জেম পালিয়ে গেলে বা পালিয়ে বেড়ালে এখানে ক্ষমতার কী আছে? এখানে মোয়াজ্জেমতো নিজেকে অনেকটা ভীতু হিসেবে প্রমাণ করালেন। উত্তরটা যোগফলের মতো মনে হলেও সমীকরণ কিন্তু জটিল এখানে।

আসেন এবার দেখি ক্ষমতার অংকে সমীকরণের সূত্র কী বলে-

কয়েকটি গণমাধ্যেমের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র অনুযায়ী, ‘মোয়াজ্জেম গাঁ ঢাকা দিয়ে ঢাকাতেই আছেন বলে, পুলিশের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এবং তার অবস্থানও জানা আছে পুলিশের।’

ফেনীর সোনাগাজী সার্কেলের এএসপি শফিকুল আহমেদ ভুঁইয়া জনিয়েছেন,‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতারে একটি টিম ঢাকায় কাজ করছে।’ সে হিসাবে এ কথা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ওসি মোয়াজ্জেম এখন ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।

তাহলে আইন অনুয়ায়ী, ওসি মোয়াজ্জেমকে এখন যেকোনও এলাকার পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে। এমনকি সাধারণ মানুষও তাকে ধরে পুলিশে দিতে পারেন।

এ ঘটনায় ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলছেন?

ওবায়দুল কাদের বলেছেন,পলাতক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে যে কোনো মূল্যে গ্রেফতার করা হবে। সরকার এ ব্যাপারে সিরিয়াস।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন,‘অপরাধী হলে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে শাস্তি পেতেই হবে। নুসরাত হত্যাকাণ্ডে দায়িত্ব অবহেলায় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিচার হবে। সে যতোটুকু অপরাধ করেছে তাকে তার শাস্তি পেতেই হবে।অপরাধের সঙ্গে যে–ই জড়িত থাকুক, তাকে শাস্তি পেতে হবে’ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সে ওসি হোক কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হোক আর জনপ্রতিনিধি হোক।’

এবার আসেন, সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করি। পারলে পারলাম নইলে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের কাউকে খুঁজতে হবে!

সাবেক ওসি যদি মোয়াজ্জেমের অবস্থান সম্পর্কে যদি পুলিশ জেনেই থাকে তাহেল তাকে গ্রেফতার কেনো করা হচ্ছে না? তবে, এটা কি সেই ওসি মোয়াজ্জেমের ক্ষমতা নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অক্ষমতা? বেশি কিছু আর লেখার প্রয়োজন নেই মনে করছি।  

আমি বিশ্বাস করি, এই সমীকরণ মেলাতে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের কারও সাথে আর কন্টাক্ট করতে হবে না। আমি দৃঢ়তার সাথে এও বিশ্বাস করি, নুসরাত হত্যার আগে ও পরে নুসরাত ও তার পরিবারের সাথে মাদ্রাসার ওইসব অভিযুক্তরা এবং ওসি মোয়াজ্জেম যা করেছে তা বরাবরই বারবার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে/করছে। এসব বিষয়ে দেশের জনসাধরণ বেশ অবগত আছেন।

ফলে, নুসরাতের সাথে যা ঘটেছে তা পরবর্তীতে এমন আরেকটি নুসরাত ঘটনা যাতে সৃষ্টি করার সাহস কেউ না পায় সেজন্য মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারে গড়িমসি না করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করেন এবং নুসরাত ও তার পরিবারকে একটু স্বস্তি দিন। একইসাথে একজন ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর অবস্থান পরিষ্কার করে জানসাধারণের নেতীবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলে জনগণকে পুলিশের আরও কাছে আসার ব্যবস্থা করেন।

আপনাদের প্রতি জনসাধরণের ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পাবে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সাথে জনতার সম্পর্ক সকল অপরাধের বিরুদ্ধে হবে, বাংলাদেশ বাংলাদেশর জনগণ এমন সেই প্রত্যাশাই আশা করে। 

রোমান শেখ

সম্পাদক- সিটিজেন নিউজ.কম.বিডি