শৈশব বন্দি স্ক্রিনে: সমস্যা শনাক্তকরণ ও মুক্তির উপায়

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৫-০৮-৩০ , ০৫:৫৩ পিএম

শৈশব বন্দি স্ক্রিনে: সমস্যা শনাক্তকরণ ও মুক্তির উপায় ছবি: নাগরিক পত্রিকা

ময় এখন তথ্যপ্রযুক্তির-এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু এ যুগে অগ্রগতি যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নিয়ে এসেছে নতুন এক বিপদও-শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি। বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম-সব জায়গাতেই দেখা যায়, হাঁটতে শেখা ছোট্ট শিশুর হাতেও ফোন। কখনও ইউটিউবের কার্টুন, কখনও মোবাইল গেম, আবার কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকে স্ক্রিনের ভেতর। অথচ এই বয়সে তাদের বেড়ে ওঠা উচিত প্রকৃতির সান্নিধ্যে, খেলাধুলায়, বই পড়ায় এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার মাধ্যমে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা শিশুদের চোখের সমস্যা, নিদ্রাহীনতা, স্থূলতা, মনোযোগের ঘাটতি, এমনকি আচরণগত বিকারও দেখা দেয়। আরও ভয়ংকর হলো, মানসিক বিকাশের পর্যায়ে থাকা শিশুদের সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়। তারা বাইরের জগৎকে ভুলে গিয়ে একধরনের কৃত্রিম ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আটকা পড়ে যায়। অনেক অভিভাবক নিজের ব্যস্ততা সামলাতে শিশুদের হাতে ফোন তুলে দেন, যা সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অভিভাবকদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিশুদের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে পরিবারে এবং অভ্যাসও তৈরি হয় অভিভাবকদের কাছ থেকে। শিশুকে ফোন-আসক্তি থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের কিছু করণীয় হলো- সময় ও মনোযোগ দেওয়া। অনেক সময় অভিভাবকরা নিজের ব্যস্ততা আড়াল করতে ফোন শিশুর হাতে ধরিয়ে দেন। এটি একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিদিন কিছুটা সময় শিশুদের সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে হাঁটা, গল্প করা, খেলাধুলা করা- এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ফোন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে শিশুদের ফোন ব্যবহার না করার কড়াকড়ি নিয়ম করতে হবে। ফোন শিশুর হাতে দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতা’ দেওয়া যাবে না। বরং অভিভাবকের উপস্থিতিতে সীমিত সময়ে ব্যবহার করতে দেওয়া যেতে পারে। বিকল্প বিনোদন তৈরি করা বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জাগাতে হবে। গল্পের বই, চিত্রপুস্তক বা ধাঁধা শিশুদের আকৃষ্ট করতে পারে। খেলনা, পাজল, ছবি আঁকা, সঙ্গীত- এসব সৃজনশীল কর্মকান্ডে উৎসাহিত করতে হবে। শিশুদের মাঠে খেলতে পাঠাতে হবে। শারীরিক খেলা ও সামাজিক মেলামেশাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প। নিজেদের আচরণে দৃষ্টান্ত স্থাপন শিশুরা যা দেখে তাই অনুসরণ করে। অভিভাবকরা যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তবে শিশুর কাছেও সেটি স্বাভাবিক মনে হবে।

তাই বাড়িতে ফোন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং শিশুর সামনে অকারণে ফোনে ডুবে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। পরিবারে ফোনমুক্ত সময় নির্ধারণ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় যেমন- খাওয়ার সময় বা সন্ধ্যার আড্ডায়- ফোন ব্যবহার না করার পারিবারিক নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে। এতে শিশু শিখবে, পরিবারই আসল জায়গা, ফোন নয়। শিশুর মানসিক পরিবর্তন বা আচরণগত সমস্যা অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে শিশুর কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশুদের ফোন আসক্তি কমাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিভাবককে শিশুদের সময় দিতে হবে। বিকল্প বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে হবে- যেমন পারিবারিক আড্ডা, গল্প শোনা, বই পড়া, আঁকাআঁকি বা খেলাধুলা। ‘নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার’ শেখানো জরুরি। অর্থাৎ, পড়াশোনা বা শেখার প্রয়োজনে সীমিত সময়ের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনওই মূল বিনোদন না হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে ভূমিকা পালন করা দরকার তা হলো- স্কুলে খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সৃজনশীল ক্লাব সক্রিয় রাখতে হবে, যাতে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে আকৃষ্ট হয়। শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ঝুঁকি ও সঠিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। একাডেমিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে শিশুদের জন্য কিছুটা বিশেষ সময় নির্ধারণ করা দরকার। এসবের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেরও প্রয়োজন আছে। যেমন, শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

শিশু-কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর গেম ও অ্যাপস নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে- “ফোন নয়, খেলাধুলায় মন” ধরনের স্লোগান জনপ্রিয় করা যেতে পারে। এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমরা যদি শিশুদের স্বাভাবিক জীবন থেকে সরিয়ে কেবল ফোন-নির্ভর করে ফেলি, তবে তারা একদিন বাস্তব জগতে টিকে থাকতে পারবে না। যে সমাজে শিশুরা খেলতে জানে না, গল্প করতে জানে না, মানুষকে বুঝতে শিখে না- সে সমাজ অচল হয়ে পড়ে।

সুতরাং এখনই সময় পরিবার ও সমাজকে একসাথে এগিয়ে আসার। শিশুদের বুঝাতে হবে- প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়, তবে এর অযাচিত ব্যবহার অবশ্যই ক্ষতিকর। শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দরকার সুষম সমাধান- যেখানে প্রযুক্তি থাকবে শেখার উপকরণ হিসেবে, কিন্তু জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হবে প্রকৃতি, পরিবার, বই এবং খেলার মাঠ। আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক সুস্থ, স্বাভাবিক ও সৃজনশীল শিশুদের হাতে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।