রোমান শেখ
আপডেট: ২০১৯-১১-০৪ , ০৬:১৮ পিএম
ছবি: ইন্টারনেট
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও প্রগতি এই স্লোগানকে সামনে রেখে সেবার ব্রত নিয়ে সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছে গোটা দেশব্যাপী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সব ধরনের অপরাধ বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধসহ জননিরাপত্তায় পুলিশের অংশগ্রহণ নি:সন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। পুলিশের ওপর অর্পিত এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা সুনাম যেমন কামিয়েছেন; তেমনি গুটি কয়েক সদস্যর জন্য দুর্নামের ভাগও কাঁধ থেকে সরাতে পারেনি।
ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে দেখেছি, পুলিশ সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে যেসব সেবা দিয়ে যাচ্ছে; দেয়ার চেষ্টা করছে, তাতে করে যে পরিমাণ সুনাম পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি তীর দুর্নামের! একটা সহজ ভাষা এমন যে- ‘যা করবেন তার ফল পাবেন।’ তাহলে, পুলিশের খারাপ কাজে গালি আর দুর্নাম হলে, ভালো কাজে সুনাম, বাহবা বা উৎসাহ কেনো নয়?
এমন প্রশ্নের উত্তর এবং আলোচনার আগে বাংলাদেশ পুলিশ সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য জানা দরকার। এসব সাধারণ তথ্য কেন জানা দরকার; কাদের জন্য জানা দরকার? এমন প্রশ্নের উত্তর এখানেই শেষ হওয়া দরকার। দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন; তাদের জন্য তথ্যগুলো জানা দরকার।
পুলিশ বাহিনী ও বাংলাদেশ সময়কাল:
মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ পুলিশ নামে সংগঠিত হয়। বাংলাদেশ পুলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশ বাহিনীর মতো আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, জনগনের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রধান ভুমিকা পালন করে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ পুলিশের ট্রাডিশনাল চরিত্রে বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শুধু আইন পালন আর অপরাধ প্রতিরোধ বা দমনই নয় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। গত এক দশকে জঙ্গীবাদ দমন এবং নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। পুলিশের সদস্যরা তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর পেশাদরিত্ব দিয়ে অপরাধ মোকাবিলায় প্রতিনিয়ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। ঘুষ দুনীর্তির কারনেও বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত এই বাহিনী তার পেশাদরিত্ব আর জনগনের প্রতি দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে জনগনের গর্বের বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা:
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময় হল ১৯৭১ সাল। মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, বেশ কয়েকজন এসপি সহ প্রায় সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্য বাঙ্গালীর মুক্তির সংগ্রামে জীবনদান করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস হতেই প্রদেশের পুলিশ বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছিল পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার। পুলিশের বীর সদস্যরা প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে ঢাকার রাজারবাগের পুলিশ লাইন্সে ২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বাতিল .৩০৩ রাইফেল দিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। এই সশস্ত্র প্রতিরোধটিই বাঙ্গালীদের কাছে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর বার্তা পৌছে দেয়। পরবর্তীতে পুলিশের এই সদস্যরা ৯ মাস জুড়ে দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১২৬২ জন শহীদ পুলিশ সদস্যের তালিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। সূত্র: উইকিপিডিয়া।
দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন; তাদের বহু প্রশ্নের অন্যতম হলো-পুলিশ কেন ঘুষ খায়?
তাছাড়া, কেন এ বাহিনীর এত দুর্নাম। এমন হাজারো প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাওয়াটাই স্বাভাবিক।
এসব প্রশ্ন যারা করেন, দয়াকরে তাদের প্রশ্ন করেই ইতি টানা উচিত নয়! ঘুষ প্রশ্নে তাদেরও তলিয়ে দেখা প্রয়োজন পুলিশ কেন ঘুষ খায়!
প্রাপ্ত তথ্য এবং ব্যক্তিগত মতামতের জায়গা থেকে যদি বলি, পুলিশ ঘুষ খায় না, খাওয়ানো হয়, এমনটা- বললেও অত্যুক্তি হবে না। আমাদের দেশের পুলিশকে দিয়ে কাজ করানো হয় বেশি আর বেতন দেয়া হয় কম। এ দেশে প্রতি ১ হাজার ৪০০ জনের জন্য যেখানে ১ জন পুলিশ নিয়োজিত সেখানে পাশের দেশ ভারতে মাত্র ৪০০ জনের জন্য ১ জন, পাকিস্তানে ৩০০ জনের জন্য ১ জন পুলিশ রয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের পুলিশকে পর্যাপ্ত পরিবহন না দিয়েই কাজ করতে বলা হয়। অন্যের গাড়ি রিকুইজিশন কিংবা গাড়ি ফাও নিয়ে কাজ করতে হয় পুলিশকে। লাশ বহনের টাকা ঠিকমতো দেয়া হয় না, টিএ-ডিএও অপ্রতুল। পুলিশকে হামেশাই রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হয় এ দেশে। ফলে পুলিশ অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে কারণে-অকারণে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়। এসবের পর সোজা-সাপ্টা কথা হলো- ‘আপনি ঘুষ দেয়া বন্ধ করেন; তিনিও ঘুষ পাওয়ার আশা ছেড়ে দিবেন।’
তাছাড়া, পুলিশের কর্ম ব্যবস্থাপনা, বেতন-ভাতা, অসঙ্গতি, ক্রটি-বিচ্ছেদ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয় পর্যায়ক্রমে ভাবছেন, আলোচনা করছে সরকার। বিশাল একটি বাহিনীকে আরও সু-শৃঙ্খল করতে সময়ের প্রয়োজন। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন।
দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন;তাদের প্রশ্ন-কিছু পুলিশ সদস্য কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি গড়েছে-করেছে। দ্যাটস ইট! ‘কিছু পুলিশ সদস্য।’
এমন প্রশ্নের উত্তর বেশ সোজা তবে, প্রশ্নকারীদের কাছে জটিল বটে।
উদাহরণ: গার্মেন্টস। মানে পোষাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বিদেশি বিনিয়োগকারী বা অর্ডার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বিভিন্ন পোষাক তৈরি প্রতিষ্ঠানে কাজের অর্ডার করেন, তখন প্রতিটা পণ্যর একটি নির্দিষ্ট দাম চূড়ান্ত করেই চুক্তি করেন। টাকার বিনিময়ে পণ্য। ক্রেতারা টাকা দিবেন আর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পণ্য বুঝিয়ে দিবেন। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যগুলো তৈরি করার সময় উৎপাদকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত: দু’টি নিয়ম করে দেন। প্রথমটি হলো-পণ্যর কোয়ালিটি বা মান আর দ্বিতীয়টি হলো- পণ্য সময় মত বুঝিয়ে দেয়া।
যেহেতু ক্রেতারা টাকা দিয়ে পণ্য কিনবেন সেহেতু পণ্যের কোয়ালিটিতো আর খারাপ নিবেন না। আবার পণ্যর সংখ্যা/পরিমান যেহেতু লাখ লাখ সেহেতু সব যে ভালো হবে-তাও না। এমতাবস্থায় উভয় পক্ষের মধ্যে যাহাতে কোনও প্রকার জটিলতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য পণ্য ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি ১০০ টি পণ্যর জন্য একটি একসেপ্টেবল কোয়ালিটি লেবেল (একিউএল)ফিক্সড করে দেন।
ধরা যাক, একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে একিউএল দিলেন, ২.৫। তার মানে হলো- প্রতি ১০০টি পণ্যের মধ্যে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি ২.৫ অথবা আড়াই পিছ খারাপ হলেও নিবেন।
দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন; তারা আমার এমন উদাহরণটি পড়ে ভ্রুঁ কুঁচবেন না নিশ্চই। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে লাখ লাখ পুলিশ সদস্য রয়েছে। গার্মেন্টস সেক্টরের মত এমন ২.৫ বা শতে আড়াই পিছ খারাপ পুলিশ সদস্যর দায় পুরো বাহিনীর কাঁধে চাপিয়ে দূর থেকে গালি দেয়াটা মোটেও সমুচিত নয়।
দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন;তাদের এবারের প্রশ্ন ‘তবুও পুলিশ খারাপ।’
এমন প্রশ্নে-দূর থেকে পুলিশকে গালি দেয়া মানুষগুলোকে বলবো, গালি দিচ্ছেন দেন। দূর থেকে দিচ্ছেন। পুলিশ আপনার গালি দেয়া ঠেকাতে পারবে না। কেবল আপনারা যারা গালি দেন, দিচ্ছেন তারা সেবা নিতে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে একবার পুলিশের দরজায় আসুন। আমার ব্যক্তিগত মতামত থেকে জানাচ্ছি, দিন বদলেছে। সেবা পাবেন নিশ্চিত।
বলে রাখি, যে পুলিশ সদস্যর কাছে সেবা নিতে যাবেন তার কাছে যদি সেবা না পান বা তিনি যদি বিলম্ব করেন; তাহলে প্রতিটি থানার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আছে তাকে জানান। আগের সমস্যা তিনি করলে সহকারী পুলিশ কমিশনার/সহকারী পুলিশ সুপার আছেন; তাকে জানান। উপরে যেতে চাইলে সহকারী উপ-পুলিশ কমিশনার/ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তা না হলে, উপ-পুলিশ কমিশনার/ পুলিশ সুপারের কাছে যান। এখনও অসুন্তুষ্ট? পুলিশ কমিশনার আছে, ডিআইজি আছেন। আপনার যেতে মানা নেই! পুলিশের মহা পরিদর্শক আছেন; আছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ও।
দূর থেকে যারা পুলিশকে গালি দেন; আপনাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে ২৪ ঘন্টা ৯৯৯ তে টোল ফ্রি পুলিশ জনসেবা চালু করেছেন। দূর থেকে গালি না দিয়ে এবার একবার বিপদে পড়লে সেবা নিতে কাছে যান/আসুন বা কল করুন। আশাকরি আপনার নেতীবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইতিবাচক হবেই।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.