মিটার রিডার ফরিদের দৌরাত্ম্য: লকড মিটার দিল রৌফবাদের বেদখল সরকারি জমিতে

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৯-০১ , ০৬:২৩ পিএম

মিটার রিডার ফরিদের দৌরাত্ম্য: লকড মিটার দিল রৌফবাদের বেদখল সরকারি জমিতে ছবি: নাগরিক পত্রিকা

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলের 'ষোলশহর' বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের একটি ‘লকড’ মিটার গ্রাহকের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছেন মিটার রিডার ফরিদ। তিনি কৌশলে একজন গ্রাহকের মিটার লক হয়েছে বলে ‘ডাবল’ টাকার বিনিময়ে তাকে নতুন মিটার দেয়। লক হয়েছে বলে আবার সেই মিটার মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের (ত্রাণ ও পুনর্বাসন) ভূমি দখল করা ইকবালে হোসেন রনি নামে এক ভূমিদস্যুর কাছে।

মো: নুরুল আলম। পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। থাকে সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির পাশে। প্রায় ৪ বছর আগে একটি মিটার সংযোগ নেন মিটার রিডার ফরিদ নামে পিডিবি’র এক কর্মচারীর সাথে চুক্তি করে। ফরিদ তাকে মিটারের যে সংযোগটি দিয়েছিল সেটির মিটার নম্বর ০১০২১০৯৫০৫৬১, গ্রাহক নম্বর এ/২৮০৮৫, অনুমোদিত লোড-৩ কে.ডব্লিউ।

নুরুল আলমের তথ্য মতে, মিটার সংযোগের একদিন পর ফরিদ তার মিটারটি লক করে দেয় এবং ফরিদ তাকে ফোন করে জানায়, তার মিটারটি লক হয়ে গেছে। তাকে নতুন আরেকটি মিটারের সংযোগ নিতে হবে।

পরে, নুরুল আলম মিটার রিডার ফরিদের কথায় বাধ্য হয়ে আরেকটি সংযোগ নেন। যার নম্বর ০১০২১০৯৬২১৫১ এর গ্রাহক নম্বর এ/২৯০৬৪-১, অনুমোদিত লোড-২ কে.ডব্লিউ।

নুরুল আলম নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটিতে আমি প্রহরী হিসেবে চাকরি করতাম। সোসাইটি আমার প্রতি মানবিকতা দেখিয়ে সোসাইটির পাশে একটি থাকার জায়গা দেয়। ওই জায়গায় আমি প্রায় ৪ বছর আগে একটি বিদ্যুতের ০১০২১০৯৫০৫৬১ নম্বারের (মিটার) এবং গ্রাহক নম্বর এ/২৮০৮৫ মিটার স্থাপন করি।

তিনি বলেন, মিটারটি সংযোগের একদিন পর বিদ্যুৎ অফিস থেকে ফরিদ ফোন করে ‘আমাকে জানায় যে, মিটারটি লক করা হয়েছে এবং নতুন মিটার নাম্বার নিতে হবে। পরে আমাকে ফরিদ আবার একটি নতুন সংযোগ দেয়। যে মিটারটির নম্বর ০১০২১০৯৬২১৫১ এর গ্রাহক নম্বর এ/২৯০৬৪-১, অনুমোদিত লোড-২ কেডব্লিউ। কিন্তু আগের লক করে দেওয়া মিটারটি কে বা কারা চালাচ্ছে সে বিষয়ে তিনি অবগত নয় বলে জানান।’

নুরুল আলমের দেওয়া মিটারের তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে, নুরুল আলমের বর্তমান মিটারটি আমিন জুট মিলস এলাকার মৃধা পাড়া এলাকার ঠিকানায় ইস্যু করা হয়েছিল। যদিও তার পূর্বের এবং বর্তমান ঠিকানা সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি।

এখন প্রশ্ন হলো, নুরুল আলমের নামে থাকা প্রথম মিটারটি (০১০২১০৯৫০৫৬১) ‘লকড’ হয়েছে বলে নতুন মিটার নিতে বাধ্য করে ওই একই মিটার একজন ভূমিদস্যুকে ব্যবহারে কোন পিডিবির মিটার রিডার ফরিদ কেন সহায়তা করলো? একইসাথে নুরুল আলমের ঠিকানা সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি হলেও নতুন মিটার নিতে বাধ্য করে (০১০২১০৯৬২১৫১) সেই মিটারে আমিন জুট মিলের মৃধা পাড়া ঠিকানা কেন দিলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফোন করা হয় মিটার রিডার ফরিদকে। নাগরিক পত্রিকার কাছে তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘মিটার সংযোগ আমি দিয়েছি কিন্তু ওই মিটার রৌফবাদে কেন যাবে সেটা বুঝে উঠতে পারছি না।’

নুরুল আলমের বর্তমান ঠিকানা সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি কিন্তু তার মৃধা পাড়া ভুয়া ঠিকানা কেন দিলেন- এমন প্রশ্নের তিনি কোনও সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলেও বলেন, ‘নাম ঠিকানা এন্ট্রি দিতে ভুল হইছে মনে হয়।’

একজন মিটার রিডার হয়ে কোনও গ্রাহককে মিটার সংযোগ দেওয়ার এখতিয়ার আপনার আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘না’ বলেন।  

নাগরিক পত্রিকা গত ২৯ আগস্ট ‘‘রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সাইনবোর্ড খুলে জায়গা দখল ভূমিদস্যু রনিং গংয়ে’’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনের সরকারের সংরক্ষিত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জায়গা দখল করে গ্যারেজ করা হয়েছে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন তথ্য উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ হয়।

সংবাদটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হলে এ বিষয়ে তদন্ত করে যথাযাথ ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্যোগ নেয়। পরে সহকারী প্রকৌশলী রাশেদ হাসান পিন্টু সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায়।

সহকারী প্রকৌশলী রাশেদ হাসান পিন্টু নাগরিক পত্রিকাকে গত ৩১ আগস্ট জানান, মিটারটি অবৈধভাবে চালানো হচ্ছে। অফিসে গিয়ে মিটারটি লক করা হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলের 'ষোলশহর' বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ছানা উল্লাহ নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, মিটার অলরেডি লক করা হয়েছে। সরকারি জায়গায় এভাবে মিটার স্থাপন অবৈধ। মিটারটি যে কোনও সময় খুলে নিয়ে আসা হবে। মিটার রিডারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ কামাল উদ্দিন আহমেদ নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ছানা উল্লাহকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।