৯/১১:
মুরাদ হোসেন । মিশিগান প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৭-২৮ , ০৯:২৯ এএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর—আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেদিন নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। টেলিভিশনের পর্দায় টুইন টাওয়ারের ধসে পড়ার দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। কোটি কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সেই ঘটনার সাক্ষী হন।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ৯/১১ কেবল একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, কূটনীতি, গণমাধ্যম এবং জনমত গঠনের ইতিহাসে একটি বড় বাঁকবদল। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দর নিরাপত্তা জোরদার হয়, নতুন নজরদারি ব্যবস্থা চালু হয় এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক অভিযানের সূচনা ঘটে। একই সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম হয়।
সেদিন বোস্টন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসগামী আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট–১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট–১৭৫ দক্ষিণ টাওয়ারে বিধ্বস্ত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম প্রতীকী স্থাপনা টুইন টাওয়ার ধসে পড়ে। একই দিনে আরেকটি বিমান পেন্টাগনে আঘাত করে এবং আরেকটি বিমান পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এসব হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানায়, হামলার জন্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা দায়ী এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন ওসামা বিন লাদেন। পরবর্তী সময়ে এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। একই সঙ্গে শুরু হয় ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (War on Terror), যা পরবর্তী দুই দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা নীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে ৯/১১–এর ইতিহাস শুধু হামলার ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক, বিকল্প বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক প্রশ্ন। বিভিন্ন গবেষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ৯/১১–এর পর গণমাধ্যম যেভাবে ঘটনাটিকে উপস্থাপন করেছে, তা জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের মতে, গণমাধ্যমের পুনঃপুন প্রচার মানুষের স্মৃতিতে একটি নির্দিষ্ট আখ্যানকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
টেলিভিশনের পর্দায় ধসে পড়া টাওয়ার, আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষ এবং উদ্ধার অভিযানের দৃশ্য দিনের পর দিন সম্প্রচারিত হয়েছে। ফলে অনেকের কাছে ৯/১১ কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। জার্মান দার্শনিক ও সংস্কৃতিবিদ ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বহু আগেই বলেছিলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে একই দৃশ্য বারবার পুনরুৎপাদন মানুষের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। ৯/১১–এর পর সেই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ যেন আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করা অনেক লেখকও মনে করেন, কোনো দৃশ্য যত বেশি পুনরাবৃত্তি হয়, তা তত দ্রুত জনস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্নও ওঠে—একটি ঘটনার পুনরাবৃত্ত দৃশ্য কি বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে, নাকি কখনো কখনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু ৯/১১–এর ঘটনাকে ঘিরে এ বিতর্ক আজও থেমে যায়নি।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মুসলিম সমাজকে ঘিরে জনমতের পরিবর্তন। হামলার পর পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের প্রতি সন্দেহ, বৈষম্য এবং সামাজিক দূরত্বের নানা ঘটনা সামনে আসে। সমালোচকদের একাংশের মতে, কিছু গণমাধ্যমে মুসলিম পরিচয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা বহু সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় পরিচয় ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে এক ধরনের ভুল সম্পর্ক তৈরি করেছিল। অন্যদিকে অনেকে যুক্তি দেন, সন্ত্রাসী সংগঠনের আদর্শ ও ধর্মকে এক করে দেখার প্রবণতাই এই বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ।
এই বিতর্কের মধ্যেই ৯/১১–এর ঘটনাকে ঘিরে আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে—গণমাধ্যম কি কেবল তথ্য পরিবেশন করেছিল, নাকি জনমত গঠনেরও একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা থাকবে এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে। (প্রথম পর্ব)
'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.