আনোয়ারা কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে ভিন্নচিত্র

বিয়ের জৌলুষ নেই, ‘নগদ’ আবদার বেড়েছে যৌতুকে

 মো. ইমরান হোসাইন । আনোয়ারা প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২০-০৭-২৬ , ১২:৪২ পিএম

বিয়ের জৌলুষ নেই, ‘নগদ’ আবদার বেড়েছে যৌতুকে ছবি: সিটিজেন নিউজ

করোনাভাইরাসের আতঙ্কে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কমিউনিটি সেন্টার গুলোতে নিভে গেছে নীল-লাল বাতি। বন্ধ রয়েছে কমিউনিটি সেন্টার গুলো। বিয়ের পাকাপাকি কথার পরও দিনের পর দিন পিছিয়ে যাচ্ছে বিয়ের তারিখ।

এদিকে করোনার কারণে সীমিত আয়োজন ও পরিসরে যেসব বিয়ে হচ্ছে তাতে বদলে গেছে চিরায়ত ধরণ। বরযাত্রী, খাবারের জৌলুষ, আলোকসজ্বা সবই কমে গেছে। তবে এসব খাতে খরচ কমার অজুহাতে অনেক বিয়েতে বরপক্ষে যৌতুকের চাহিদা বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ খাবারের আয়োজন সীমিত করে সেই টাকা নগদে পরিশোধের দাবি করছেন বলেও জানা গেছে। তবে মেয়ের সুখ শান্তির কথা ভেবে পরিচয় প্রকাশ করে কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

চট্টগ্রাম শহরের কাছের উপজেলা আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে গড়ে উঠেছে অন্তত অর্ধশত কমিউনিটি সেন্টার। এর মধ্যে অন্তত ২০টি কমিউনিটি সেন্টারে শীতাতপ ব্যবস্থাসহ নানা অভিজাত সুবিধা রয়েছে। যে গুলোতে শুধু এক বেলা অনুষ্ঠান আয়োজনের খরচ ৫০ হাজার টাকার বেশি।

কমিউনিটি সেন্টার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা এসব কমিউনিটি সেন্টারে প্রতিমাসে কমপক্ষে এক হাজার বিয়ে, জন্মদিন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকত। এর মধ্যে বৃহস্পতি, শুক্র, শনি এই তিনদিনে অনুষ্ঠান হতো বেশি। গত মার্চে করোনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৪ মাসে কোন অনুষ্ঠান নেই বললেই চলে। নেই কোনো হৈ হুল্লোড়। কমিউনিটি সেন্টারের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা সেন্টারের অলস সময় পার করছেন।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে অনেকেই পাকাপাকি কথার পর বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দিয়েছেন। বিয়েই নয়, গণজমায়েত এড়াতে মার্চ থেকেই বন্ধ রেখেছেন জন্মদিন, আকিকা, সুন্নতে খাতনা, বিয়ে বার্ষিকীসহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা পড়ছেন বিপাকে পড়েছেন। টানা ৪ মাস ধরে বুকিং না থাকায় প্রায় পথে বসতে চলেছেন অনেক ব্যবসায়ী।

আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদন্ডি এলাকার এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিয়েতে এখন বেশি বরযাত্রী খাওয়াতে হচ্ছে না। তাতে খাওয়া খরচ কমেছে বটে। কিন্তু সেই টাকা নগদ পরিশোধ করতে বলেছে বরপক্ষ। এটা যেন করোনাকালে যৌতুকের নতুন সংস্করণ। মেয়ের বিয়ের জন্য বুকিং দেওয়া কমিউনিটি সেন্টারে টাকা গুলো পাননি ফেরতহ। শুধু তাই নয়, কিছু দিনপর কুরবান, মেয়ের জামাইকে দিতে হবে বড় দেখে একটি গরু।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে গুলোতে গিয়ে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সারা দেশে সব ধরনের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে বন্ধ। হাঁড়িপাতিল গুলো যেন অবহেলায় পড়ে আছে কমিউনিটি সেন্টারে কোণে। বর-কনের আসনও ফাঁকা। যেসব শ্রমিকদের দম ফেলার ফুসরত থাকার কথা নয়, ওই শ্রমিকেরা চলে গেছেন তাদের বাড়িতে। কেউ বা বসে অলস সময় পার করছেন। অন্যদিকে ডেকোরেটর ব্যবসায়ীদের উপার্জনের সব পথ হয়ে গেছে বন্ধ।

কমিউনিটি সেন্টার শুধু নয় মাইক, সাউল্ড সিষ্টেম, লাইটিং, টেবিল-চেয়ার ভাড়ার ব্যবসায় চলছে দুর্দিন। আয় না থাকায় অনেকে কর্মচারী বিদায় নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে। মাসের পর মাস বাকি পড়ে থাকছে দোকান ভাড়াও। এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন যে জিনিসপত্র বিক্রি করে ধারদেনা মেটাবেন সেই উপায়ও নেই বলেও জানান আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের বাবুল মাইক সার্ভিসের মালিক মোহাম্মদ বাবুল।

ডেকোরেটর ব্যবসায়ীরা ও কমিউনিটি সেন্টারের মালিকরা জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে ও গণজমায়েত বন্ধ থাকায় কয়েক মাসে বিয়ের অনুষ্ঠান বলা যায় একপ্রকার বন্ধই আছে। হাতে গোনা যে কয়টি বিয়ে হচ্ছে তাও ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাদামাটা আয়োজনে দুপক্ষের কয়েকজনের উপস্থিতিতে ঘরেই রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অথচ আগে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য দুই মাস আগে থেকেই কমিউনিটি সেন্টারে বুকিং দিতে হতো। সেখানে বর্তমানে বন্ধ কমিউনিটি সেন্টার গুলোতে জ্বলছে না লাল-নীল মরিচাবাতি ও বিয়ের সানাই।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকার এক কমিউনিটি সেন্টারে দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার বলেন, বিগত ৪ মাস ধরে সেন্টারের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যাদের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য বার-বার বিরক্ত করছে। কিন্তু টাকা তো আমরা মালিককে দিয়ে দিয়েছি। এখন তো মালিকও শহরে গিয়ে বসে আসে। আবার অনেকে দেশের পরিস্থিতি ভালো হলে আবার অনুষ্ঠান করবেন বলে টাকা ফেরত নিচ্ছেন না। তবে এ পর্যন্ত আমাদের ৫টি অনুষ্ঠান বাতিল। এই সেন্টারে দুপুরে অনুষ্ঠান হলে ৩০ হাজার টাকা এবং রাতের অনুষ্ঠানের জন্য নেওয়া হতো ৩৫ হাজার টাকা। অনুষ্ঠান বাতিলেই ক্ষতি হয়ে গেছে লাখ টাকার মতো।

তিনি আরও জানান, রমজানের আগে ও ঈদের পর বিয়ের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এবার পরিস্থিতি অন্য রকম। কর্মীদের বেতন দেওয়াই সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। তবে নিজেরা বাঁচতে চাইলে এর বিকল্পও নেই। সরকার গণজমায়েতসহ সব ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। কাস্টমারও আসে না। তাই সেন্টারের লাল-নীল বাতিও জ্বলে না।

চট্টগ্রাম জজ আদালতের এডভোকেট এম. লোকমান শাহ্ বলেন, করোনার পরিস্থিতি ও লকডাউনের প্রথম দিকে বিয়ের হওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল এবং ঈদের পরই বিয়ের সংখ্যা আরো বেড়ে গেছে। এতে করে বাল্যবিবাহের সংখ্যাও বেড়েছে নতুন করে। সে সাথে বেড়েছে পাত্র পক্ষের যৌতুকের চাহিদা। বর্তমানে এ সময়ে এসেও বিয়ের মত পবিত্র এ বন্ধনে যৌতুক প্রথা সম্পর্কে মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে এবং বন্ধ করতে হবে উপহার নামক এ যৌতুকের। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রাম-গঞ্জের দরিদ্র পরিবার গুলোতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা এ সময়টায় দেশে ফিরেছেন। সমাজ বাস্তবতায় প্রবাসে কাজ করা ছেলের পাত্র হিসেবে অনেক চাহিদা বেশি। আর এই অবরুদ্ধ অবস্থায় বিয়ে দিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন অনেক অভিভাবকেরা।

আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. এ কাইয়ূম শাহ্ বলেন, করোনা লকডাউন আর রমাজানের ঈদ বা কুরবানের ঈদ সব মিলিয়ে বেড়েছে বিয়ে। সবই সীমিত পরিসরে হতে দেখেছি। অনেকেই দাওয়াতও দিচ্ছে। অনেকেই বিয়েতে তেমন যাওয়া হয়নি করোনা সংক্রমণের ভয়ে। আবার সম্পর্কটা অটুট রাখতে অনেকে বিয়েতে না গেলেও উপহার সরূপ পাঠিয়ে দিয়েছি। আর করোনাকালে ছেলে মেয়ের বিয়েতে কমে গেছে আত্মীয় স্বজনদের খাওয়া দাওয়ার বিষয়টা বেশিভাগ মানুষই এসবই খরচ বাবদ নগদ টাকা নিয়ে সেরে পেলছেন বিয়ের আয়োজন। ধরতে গেলে এটাও এক ধরণের যৌতুক। যেটা কারো কাম্য নয়। আমরাও নজর রেখেছি আমার এলাকায় যেন কোনো মেয়ে বাল্য বিবাহের শিকার না হয়। কেউ বিয়েতে দাওয়াত দিতে আসলে সব প্রথম জিঞ্জেস করছি মেয়ের বয়স কত, পাত্র পক্ষকে কি কি দিতে হচ্ছে। সবার মুখে একই কথা তেমন কিছু না। খাওয়া দাওয়া বাবদ নগদ টাকা।

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, বাল্য বিবাহ হয়েছে এরকম কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যদি কেউ প্রমাণ সহকারে দিতে পারে তাহলে দুপক্ষের অভিভাবক ও কাজীসহ জড়িতদের প্রচলিত আইনের আওয়াতায় আনা হবে এবং যে কাজী বিয়ে পড়িয়েছে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন নজরদারীতে রয়েছে কোন বাল্য বিবাহ হচ্ছে কিনা। বাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার বা রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করানোর খবর পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।