ড. এ. এম. ইউসুফ জিলানী
আপডেট: ২০২০-০৫-২০ , ০৭:২২ পিএম
ছবি: ইন্টারনেট
লায়লাতুল কদর অত্যন্ত ফজিলতমন্ডিত মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বরকত আমল এ ছিলো যে, তিনি রমজানুল মুবারকের শেষ দশকে ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে নিয়োজিত হয়ে যেতেন আর সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন আর আহলে বাইয়াতকে ইবাদতের জন্য জাগাতেন। [ইসমাইল হক্কি, রূহুল বয়ান, ১০: ৪৮৯।]
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম রমজানের ২৭ তারিখ লাইলাতুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মত প্রকাশ করেছেন। তাই বলে শুধুমাত্র ২৭ তারিখ একদিন লাইলাতুল কদর এটা আবশ্যক মনে করে, আর অন্যান্য রাতগুলো হেলায় ফেলায় ও অলসতায় কাটানো ঠিক নয়। লাইলাতুল পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো রমজানের শেষ বেজোড়গুলো যথাসম্ভব বেশি ইবাদত বন্দেগী এবং যিকর আযকার ইত্যাদিতে অতিবাহিত করা উচিত। নিম্নে কদরের রাত্রির কিছু করণীয় ও আমল উল্লেখ করা হলো-
কুরআন তেলাওয়াত
কুরআন তেলাওয়াত একটি অতিব পূণ্যময় কাজ। এর প্রতিটি অক্ষরেই রয়েছে পূণ্য আর পূণ্য। তাই এ রাতে বেশী করে কুরআন তেলাওয়াত করবেন।
যে কোনো সুরাই আপনি পড়তে পারেন যা আপনার জন্য সহজ। তবে এ সূরাগুলো পড়তে ভুলবেন না। কদরের রাত্রে বুজুর্গানে দ্বীন এ সুরাগুলো বেশী করে পাঠ করতেন। ক. আয়তুল কুরসি খ. সুরা বাকারার শেষ আয়াত গ. সুরা জিলজাল ঘ. সুরা ইখলাস ঙ. সুরা ইয়াসিন ইত্যাদি।
তাওবা ও ইস্তেগফার
খুব বেশী তাওবা ইস্তেগফার করবেন। বিগত জীবনের সকল পাপ ও অপরাধ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন। ভবিষ্যৎ জীবনে আর কোনো পাপে লিপ্ত না হওয়ার শপথ নিবেন। আল্লাহর কাছে ভবিষ্যতে কল্যাণকর কাজের করা এবং অসৎ কর্ম বেঁচে থাকার তওফিক কামনা করবেন। নিজ পরিবার পরিজন ও সকল মুসলমানদের জন্য দোয়া করবেন। হাদিস শরিফে তাওবার বিভিন্ন দোয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
তাওবার দোয়া
সাইয়েদুল ইস্তেগফার-(তওবার শ্রেষ্ঠ দোআ)
ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺑِّﻲ ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﺧَﻠَﻘْﺘَﻨِﻲ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﺒْﺪُﻙَ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻬْﺪِﻙَ ﻭَﻭَﻋْﺪِﻙَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﻚَ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌْﺖُ ﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻚَ ﻋَﻠَﻲَّ ﻭَﺃَﺑُﻮﺀُ ﻟَﻚَ ﺑِﺬَﻧْﺒِﻲ ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻟَﺎ ﻳَﻐْﻔِﺮُ ﺍﻟﺬُّﻧُﻮﺏَ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧْﺖَ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানী ওয়া আনা আ'বদুকা ওয়া আনা আ'লা আহ্দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত’তু আ'উযুবিকা মিন শার্রি মা ছা’নাতু আবূউলাকা বিনি'মাতিকা আ'লাইয়্যা ওয়া আবূউলাকা বিযানবী ফাগ্ফির্লী ফাইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয্যুনূবা ইল্লা আনতা।
অনুবাদঃ হে আল্লাহ তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। কারন তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।
এই দোয়া সকালে পড়ে রাতের আগে মারা গেলে অথবা রাতে পড়ে সকালের আগে মারা গেলে সে জান্নাতে যাবে। [বুখারী-৬৩০৬]
দোয়া-২:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যূম ওয়া আতূবু ইলায়হি।
অনুবাদঃ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা‘বূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছে তাওবাহ্ করি।
এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন-যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী হয়। [আবু দাউদ-১৫১৭, তিরমিযী-৩৫৭৭, মিশকাত-২৩৫৩]
দরুদ শরীফ পাঠ করা
আল্লাহ তায়ালার প্রিয় একটি কাজ হলো প্রিয় নবীর উপর দরুদ পাঠ করা। এটা আল্লাহ স্বয়ং এবং তাঁর ফেরেস্তারাও করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেস্তাগণ নবীর উপর দরূদ পাঠ করেন। অতএব, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার উপর দরুদ ও সালাম পেশ করো। [আল কুরআন, ৫৬: ৩৩।]
অতএব, এ রাতে যতো ইচ্ছে দরুদ শরিফ পাঠ করবেন। দরুদ শরিফের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য আমলগুলোও কবুল করে নিবেন।
দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা
কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াসমূহ পাঠ করবেন। বিশেষত: যে সব দোয়াতে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন রয়েছে। এ রাতে যে দোয়াই করা হোক, আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করেন। তাই আপনার অভাব, অনটন, পেরেশানি, কর্জ, রিজিক, ধন-সম্পদ ইত্যাদি সকল সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট বিশেষ প্রার্থনা করবেন।
হযরত আয়েশা হতে বর্ণিত, তিনি প্রিয় নবীর কাছে জানতে চান যদি আমি লায়লাতুল কদর পেয়ে বসি তাহলে কোন দোয়াটি পড়বো? তিনি বলেন, এ দোয়াটি পড়বে, ‘‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন করিমুল তুহিব্বুল আফওয়া কাফু আন্নী।’’ অন্য একটি হাদিসে এ দোয়াটি তিনবার পড়ার কথা উল্লেখ আছে। দোয়াটি হলো: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু হালিমুন করিমুন সুবহানা রাব্ছি সামাওয়াতিছ ছাবয়ে ওয়ারাব্বিল আরশিল আজিম।’’ [ইসমাইল হক্কি, রূহুল বয়ান, ১০: ৪৮৯, সাবি ৪: ২৮৯-২৯০।]
হযরত সৈয়দা আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে শবে কদরের ওয়াজিফা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন:
اللهم أنك عفو كريم تحب العفو فاعف عني-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন করিমুল তুহিব্বুল আফওয়া ফ’াফু ‘আন্নী। [আহমদ, মুসনাদ, ৬: ১৭১-১৭২]।
হযরত সিদ্দিকা হতে আরো একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: যদি আমি লাইলাতুল কদর লাভ করতে পারি তবে পরম করূণাময়ের আফিয়াত তথা একমাত্র উভয় জগতের শান্তি ছাড়া আর কোনো কিছু প্রার্থনা করবো না। আর প্রিয়নবী থেকে বর্ণিত এ দোয়াটি এ দিকে ইঙ্গিতবহন করে।
اللهم اني أسئلك العفو والعافية و المعافاة الدائمة في الدين والدنيا و الاخرة-
উচ্চারণ; আল্লাহুম্মা ইন্নি আসয়ালুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ওয়াল মুয়াফাতা ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ। [ইসমাইল হক্কি, রূহুল বয়ান, ১২: ৩৬০।]
হযরত কাব বলেন, এ রাতে কেউ তিনবার لا اله الا الله (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) পাঠ করলে একবারের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন। আরেকবারের বিনিময়ে দোযখ থেকে মুক্তি দান করেন আর আরেকবারের বিনিময়ে জান্নাত দান করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি কাব আহবারকে জিজ্ঞাসা করলাম, যে সঠিক বিশ্বাসী তার জন্য কি এ পুরুষ্কার? তিনি বললেন, সঠিক বিশ্বাসি ছাড়া কি কেউ লা ইলাহা বলেন? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, কদরের রাত কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকের জন্য বড় ভারি হয়ে থাকে। যেন তাদের মাথার উপর পাহাড় চড়ে বসে। [ইবনে কাসির, তাফসিরে কুরআনিল আজিম , ১১: ৫৫৭।]
দান সাকদা
দান-সাদকা মানুষের সকল প্রকার বালা মুসিবত থেকে রক্ষা করে। মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। মনকে প্রশান্ত ও নরম করে। এটা বিরাট সওয়াবের কাজ। রমজানে এ দানের সওয়াব আরো হাজার গুণ বেশি। তাই শবে কদরের দানের সওয়াবের কোনো তুলনা হয় না।
নফল নামায
এ রাতে বেশি করে নফল নামায পড়া যায়। বিশেষ করে সালাতুত তাসবিহ। কারণ, এ নামায সবসময় পড়া হয় না। অথচ এ নামাযের সওয়াব খুবই বেশি। প্রিয় নবী এ নামায জীবনে একবার হলেও পড়তে বলেছেন।
মোটকথা: এমন একটি বরকতময় ফযিলতময় ও বৈশিষ্টপূর্ণ রাত অবহেলায় না কাটিয়ে আমাদের উচিত এ রাতে বেশি করে কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামায, দান-সাদকা, দোয়া-দরুদ, যিকির আযকার, ও তাওবা ইসতেগফারের মাধ্যমে কাটানো। বিগত জীবনের সকল দোষক্রুটি ও গুনাহ থেকে আল্লাহর তায়ালার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ও একনিষ্টভাবে তাওবা করা এবং নিজের জন্য, নিজের পিতামাতা ও আত্নীয়-স্বজনের জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য দোয়া করা। কারো হক থাকলে তা আদায় করা, কারো সাথে বিরোধ থাকলে তা মিটিয়ে নেয়া ও মা-বাবাসহ নিকটাত্নীয়কে কষ্ট দিয়ে থাকলে তাদের থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া ও ভবিষ্যতে এ ধরণের কাজ না করার শপথ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শবে কদরের ফয়ুজ ও বারাকাত, রহমত ও ফযিলত নসিব করুন।
'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.