নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০৯-২২ , ১২:০২ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
নিত্যপণ্যের দামে চাপে থাকা বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখনো অধিকাংশ পণ্যের দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়েনি; তবে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। এদিকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর একদিনের মধ্যেই রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে।
একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হঠাত্ এই ভাড়া বৃদ্ধিতে চরম চাপে পড়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। রাত ১২টার পর বর্ধিত দাম কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন পাম্পে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে করে জ্বালানি নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।
সোমবার রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ যদি বাড়ে, তাহলে সামনে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আমরা পাইকারি বাজার থেকে যে দামে পণ্য কিনি, পরিবহন খরচ বাড়লে সেই খরচও শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে এখনই বলা যাচ্ছে না কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে।
তবে যাত্রীবাহী পরিবহনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর প্রবেশমুখ চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দূরপাল্লার রুটেও লেগেছে এর প্রভাব। সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।
হঠাত্ ভাড়া বাড়ায় অতিরিক্ত খরচের চাপে পড়েছেন প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষেরা। এতে মাস শেষে পরিবহন ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় রাইডশেয়ারিং সেবাতেও বাড়তি ভাড়া চাচ্ছেন চালকরা। তবে এতে যাত্রী হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন ট্রাক ও পিকআপ চালকরা। উল্লেখ্য, গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর থেকেই গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে।
মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না : জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির কারণেই দেশে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ছে, জাহাজভাড়া বাড়ছে। এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় তিনি বলেন, উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান করতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তা উপলব্ধি করতে পারেন তিনি। তাই জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে ৪৫ লাখ টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য গড়ে ২০৫ টাকা। এ দফায় সমন্বয়ের আগে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। দাম সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে লোকসান করতে হচ্ছে ৭০ টাকা। আগে এ লোকসান ছিল ৯০ টাকা। দাম সমন্বয় না হলে শুধু ডিজেলে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হতো। সব তেল মিলে এটি হতো ৫০ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানি তেলে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তার কার্যক্রম ভীষণভাবে বিঘ্নিত হতে পারে উল্লেখ করে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনতে চায় সরকার। আসলে কোনো বিকল্প সামনে না থাকায় তেলের দাম বাড়ানোর মতো এ রকম একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছে। দেশবাসী সেটি উপলব্ধি করবেন বলে আশা করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় ডিজেলের মূল্য ১৩৪ টাকা। মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা। বাংলাদেশেই জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। জ্বালানি তেল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাচার হওয়ার একটা বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে যাতে তেল পাচার না হয়, তাই সরকারকে এই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণ এটি বুঝতে সক্ষম হবে। তবে দাম বাড়ানোর অভিঘাত সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ২০ পয়সা ও শহরে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব বিআরটিএর
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি সার্ভিস বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে যাত্রীস্বার্থ বিবেচনায় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সোমবার বিআরটিএর বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এই সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে তেলের বাড়তি দামের পাশাপাশি বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিআরটিএর এই সুপারিশ এখন সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্র। তবে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন ভাড়া কার্যকর হবে না।
প্রস্তাবিত নতুন ভাড়ার হার অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সিটি বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএ এলাকায় (ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ) মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.