ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০৯-০৯ , ০৭:২১ এএম

ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছবি: নাগরিক পত্রিকা

দেশে আবারও বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায়ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং গড়ে চারজনের মৃত্যু হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের সমন্বয়হীনতা এবং দেশজুড়ে একযোগে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম না চালানোর কারণেই পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন নয়, ডেঙ্গুর বাহক এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস মশার প্রজননস্থল ও ডিম পাড়ার স্থান ধ্বংসের ওপর জোর দিতে হবে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু আবারও মহামারি আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন।

নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩৪ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৪০৮ জন, ময়মনসিংহে ৭৭ জন, চট্টগ্রামে ১১৭ জন, খুলনায় ২৪২ জন, রাজশাহীতে ১১৬ জন, রংপুরে ৭১ জন, বরিশালে ১৪২ জন এবং সিলেটে ৮ জন রয়েছেন।

চলতি বছরের জুনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনের পরিস্থিতিতেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমার কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ১২৭ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩ হাজার ২১৮ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।

গত বছর ডেঙ্গুতে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখের বেশি মানুষ। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ। ওই বছর মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।

হাসপাতালে বাড়ছে জ্বরের রোগী

শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চার বছরের শিশু মারিয়াকে নিয়ে এসেছেন তার মা মারুফা বেগম (২৮)। তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে মারিয়া। ডেঙ্গুর আশঙ্কায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। মারুফা বেগম জানান, তাদের বাসার সবাই জ্বরে আক্রান্ত। হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে দেখানোর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন ওষুধ নিতে আসা রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। এক মাস আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ জন রোগী আসতেন, এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেশির ভাগ শিশুই জ্বর, শরীরে র‌্যাশ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেও তাদের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।

তিন বছরের শিশু তামান্নাকে মোহাম্মদপুর থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন তার বাবা রিয়াজ উদ্দিন। তিনি একজন ব্যাংকার। শিশুটির মায়েরও জ্বর রয়েছে এবং বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তামান্নার ডেঙ্গু নাকি হাম হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারটি।

মশা নিধনের বদলে প্রজনন বন্ধের তাগিদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি বাড়ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যটি হলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে এমনভাবে আলাদা রাখা, যাতে মশা তাকে কামড় দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে। এর কোনোটিই সফলভাবে করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, মশা নিধনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধের দিকে যেতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মেরে ফেললে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে। কিন্তু প্রজননস্থল থেকে গেলে সেখান থেকে নতুন মশা জন্ম নেবে।

তার আশঙ্কা, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।

ড. কবিরুল বাশার বলেন, খণ্ড খণ্ডভাবে অভিযান না চালিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি নিতে হবে। প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালাতে হবে। টানা দুই থেকে তিন দিন এই কার্যক্রম চালিয়ে বছরে অন্তত দুবার করতে হবে।

তিনি পাঁচটি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছে এডিস মশার আবাস ও ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার করা, দেশব্যাপী কার্যকর প্রাপ্তবয়স্ক ও লার্ভা নিধনকারী মশার ওষুধ ছিটানো, এলাকাভেদে বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, আনসার-ভিডিপি, রাজনৈতিক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিওকে সম্পৃক্ত করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা চালু করা। পাশাপাশি সারা বছর মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চালু রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।

তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী তিন মাস ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদেরও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

কর্মসূচির সমন্বয় করবে মহানগর এলাকায় সিটি করপোরেশন, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইড, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেবেন।