এপিবিএনকে ফৌজদারী অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০৯-০৮ , ০৮:২১ এএম

এপিবিএনকে ফৌজদারী অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন ছবি: নাগরিক পত্রিকা

সাইবার অপরাধ, সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানবপাচার, গুম ও ভূমিদস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে (এপিবিএন) আরও বিস্তৃত দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রেখে নতুন আইন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এপিবিএনের অধীনে সাইবার সেল গঠন এবং অপরাধ তদন্তের জন্য হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।

‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা করে সংশোধিত আকারে সংসদে পাসের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। গত ৬ সেপ্টেম্বর কমিটির বৈঠকে বিলটি পরীক্ষা করা হয়।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কমিটির সুপারিশ করা বিলটি উপস্থাপন করেন বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন।

প্রস্তাবিত আইনে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন আইন করার কথা বলা হয়েছে। এতে এপিবিএনের সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব, ক্ষমতা, তদন্ত, শৃঙ্খলা, বিচার ও দণ্ডের বিধান নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, এপিবিএনের বিভিন্ন ইউনিটে কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে সাইবার সেল গঠন করা যাবে। এপিবিএনের প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রমে সহায়তার জন্য আইনজীবী, মনোবিদ, চিকিৎসক ও বিচার বিভাগের সদস্যসহ প্রয়োজনীয় নন-পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনের দায়িত্বের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ ভিআইপিদের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবে এপিবিএন।

এ ছাড়া মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসব অপরাধের তদন্ত করতে পারবে এপিবিএন। ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতাও থাকবে। তবে এপিবিএনের কোনো সদস্য কাউকে গ্রেফতার বা কোনো আলামত জব্দ করলে তা দ্রুত নিকটস্থ থানার হেফাজতে হস্তান্তর করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এপিবিএনের জন্য দুই ধরনের আদালত

বিলে এপিবিএন সদস্যদের অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদালত এবং সংক্ষিপ্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদালত গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

বিশেষ আদালতে বিদ্রোহ, বিদ্রোহে প্ররোচনা, বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ দমনে যথাযথ চেষ্টা না করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর অপরাধজনক বল প্রয়োগের মতো অপরাধের বিচার হবে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, পোশাক বা যানবাহনের অংশ নষ্ট বা হারিয়ে ফেলা, কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল হওয়া, ডিউটি পোস্ট বা টহল পরিত্যাগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনানুগ আদেশ অমান্য, চাঁদা আদায় এবং সম্পত্তি লুট বা ধ্বংসের মতো অপরাধের বিচার হবে সংক্ষিপ্ত আদালতে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ড হতে পারে।

কোনো এপিবিএন সদস্য ৯০ দিনের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বলে গণ্য করা হবে। বিশেষ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবস এবং সংক্ষিপ্ত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।

গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএন সদস্যদের গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো সদস্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সংবাদপত্রে কোনো তথ্য বা দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না। এ ধরনের তথ্য প্রকাশে সহযোগিতা করাও নিষিদ্ধ থাকবে।

বিভাগীয় কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো শাস্তি দেওয়া যাবে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে এসব দণ্ড দেওয়া যাবে না।

প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত হবে। তবে পুরোনো আইনের অধীনে সম্পন্ন কাজ, চলমান মামলা, আবেদন, আপিল এবং বিদ্যমান বিধি-প্রবিধান নতুন আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে বহাল থাকবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সাইবার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচারসহ নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এপিবিএনের দায়িত্ব, ক্ষমতা, সাংগঠনিক কাঠামো ও জবাবদিহির আইনগত কাঠামো যুগোপযোগী করতেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।