নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০৯-০৭ , ০৮:২৩ এএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সম্পত্তি জোর করে লিখিয়ে নিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর মতো ঘটনা ঠেকাতে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পাস করেছে জাতীয় সংসদ। বিলের বিধান অনুযায়ী, বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হেবা করলেও আমৃত্যু ওই সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার তাদের হাতে থাকবে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়। তবে বিলটি নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ও কয়েকজন সংসদ সদস্য দাবি করেন, বিলের কিছু বিধান মুসলিম শরিয়া আইনের হেবা বা দান ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বিলটি পাসের আগে ইসলামিক স্কলার, ফতোয়া বোর্ড ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়ার দাবি জানান।
বিলের ওপর আলোচনায় বিরোধী দলের সদস্যরা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সন্তান বাবা-মাকে চাপ দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে পরে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঠেকাতে আইন করা প্রয়োজন। তবে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন করা উচিত নয়।
তাদের দাবি, মুসলিম আইনে হেবা কার্যকর হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো দখল বা ‘কবজা’ গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা। ফলে দান করার পরও দাতা আজীবন সম্পত্তির দখল ও ভোগদখলে থাকবেন—এমন বিধান শরিয়া আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
এ কারণে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ নিয়ে সংসদে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক হয়।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, বিলটির সঙ্গে শরিয়া আইনের কোনো সংঘাত নেই। ইসলামি আইনেও সম্পত্তির মালিকানা এবং ভোগদখলের অধিকার আলাদাভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের আদালতের রায়ের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাবা-মা সন্তানের নামে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করলেও দলিলে আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম দেশেও এ ধরনের বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, অসহায় বাবা-মাকে শেষ বয়সে যাতে নিজের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়, সে জন্যই এই আইন করা হচ্ছে। এর পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই।
বিলটির মূল উদ্দেশ্য হলো, নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করা। এর ফলে বাবা-মা সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করলেও জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন।
১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এ ধরনের দান করতে হবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বাবা-মা সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। একইভাবে নাতি-নাতনিরাও তাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে এ ধরনের সম্পত্তি দান করতে পারবেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে।
দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও দাতার ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে। এ ক্ষেত্রে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে গেলেও দাতার ভোগদখলের অধিকার সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এ অধিকার পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে জেলা জজের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন আইনটি প্রচলিত দান বা মুসলিম আইনের হেবা ব্যবস্থাকে বাতিল বা সীমিত করবে না। সাধারণ দান, হেবা এবং আইনস্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি আগের মতোই বহাল থাকবে। নতুন ব্যবস্থাটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি হিসেবে কার্যকর হবে এবং সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের আনা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে দেন। কণ্ঠভোটে প্রস্তাবগুলো নাকচ হয়ে যায়। এরপর বিলটি পাসের জন্য প্রস্তাব করা হলে সেটিও কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.