নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৯-০৩ , ০৫:৩২ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আব্দুল খালেকের চাঁদাবাজি, অন্যের জায়গা দখলের অভিযোগে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী। বিচার-শালিসের নামে নিরীহ লোকদের ধরে খালি ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এক প্রবাসীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে ওই প্রবাসীর জায়গার দেয়াল ভেঙে দখল করার অভিযোগ উঠেছে খালেকের বিরুদ্ধে।
নাগরিক পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন ৩নং ওয়ার্ডের সামাদপুর এলাকায় দিদারুল আলম নামে এক ব্যক্তি সাইফুদ্দিনসহ আরও ১০ জনের কাছ থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে সম্পাদিত একটি জায়গা রেজিস্ট্রি করেন। জায়গাটি রেজিস্ট্রি নেওয়ার পর থেকে প্রবাসী দিদারুল আলম এবং তার ভাই রনির কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছেন নগরীর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আব্দুল খালেক। দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় ইতিমধ্যে তাদের নির্মিত দেয়াল ভেঙে ফেলেছে অভিযুক্ত খালেকসহ তার অনুসারীরা-এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের। এ সংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ নাগরিক পত্রিকার হাতে এসেছে।
ভুক্তভোগিরা এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, বায়েজিদ বোস্তামী থানায় এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর প্রতিকার এবং খালেকের শাস্তি চেয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন দিদারুল আলমের পিতা জাহাঙ্গির আলম।
গত ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও সেক্রেটারীর কাছে পাঠনো ওই অভিযাগে উল্লেখ করেন ‘বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন হাজীপাড়া এলাকায় প্রবাসীর পৈত্রিক জমি দখলের চেষ্টা, ৫ লক্ষ টাকা চাঁদাবাজি, দেয়াল ভাঙচুর, মারধর,শ্লীলতাহানি ও দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন প্রসঙ্গে’- প্রতিকার চেয়ে অভিযাগ দায়ের করেন। যেখানে বায়েজিদ বোস্তামী থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব খালেককে প্রধান করে আরও ৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
জাহাঙ্গির আলম খালেকের অত্যাচরে অতিষ্ট হয়ে একই অভিযোগে পাঠানো আরেকটি অভিযোগ পাঠানো হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের দলীয় কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর।
ভুক্তভোগী জাহাঙ্গির আলমের সন্তান রনি দুবাই থেকে নাগরিক পত্রিকাকে জানান, ‘ঘাম-রক্ত ঝাড়ানো টাকায় জায়গাটি ক্রয় করি। ক্রয়ের পর থেকে বিএনপি নেতা খালেক বিভিন্ন লোকজন দিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কয়েক দফায় আমার জায়গায় নির্মিত দেয়াল ভেঙে ফেলে।’
তিনি জানান, তার পিতা জাহাঙ্গির আলম গত ১৫ এপ্রিল বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করে। ওই অভিযোগের পর পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দিলেও পরে আবার একই উদ্দেশ্যে বারবার তারা আসে। এরপর কয়েক দফা জাতীয় সেবা ৯৯৯ নাম্বারে কলে করে পুলিশ আনলেও পুলিশ আসার টের পেয়ে তারা সরে যায়।
তিনি জানান, ‘যদি কেউ প্রমাণ করাতে পারে যে এই জায়গা আমাদের নয়; তাহলে সাথে সাথে জায়গা ছেড়ে দিবো। আমার প্রবাসে কাজ করি; কারও সাথে ঝগড়া-বিভেদ করতে আমরা রাজি না।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল খালেক নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা। আমি কারও জায়গা দখল করতে যাইনি এবং কারও কাছে চাঁদাও চাইনি।’
জায়গাটির বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে খালেক বলেন, ‘দিদারুল আলম বা রনি নামে যার জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্ব মূলত জায়গাটি তাদের না। এই জায়গাটি লন্ডন প্রবাসী এনসিসি ব্যাংকের পরিচালক আনোয়ার পাশার। আনোয়ার পাশা তার জায়গাটির বিষয়ে আমাকে জানালে আমি উভয় পক্ষকে ডেকে একটি সমাধানের চেষ্টা করি।’
দেয়াল ভাঙার বিষয়ে খালেক বলেন, ‘উভয় পক্ষ উভয় পক্ষের দেয়াল ভাঙছে। লন্ডর প্রবাসী আনোয়ার পাশা করিম নামে একজনকে এই জায়গার পাওয়ার অব অ্যাটর্নী হিসেবে নিয়োগ করেছেন। আপনি চাইলে তার সাথে কথা বলতে পারেন।’
প্রবাসী দিদারুল আলম এবং তার ভাই রনি দাবি করেছেন তাদের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে খালেক বলেন, ‘আমি চাঁদা চেয়েছি এমন কোনও প্রমাণ দেখাতে বলেন।’
দিদারুল নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, আনোয়ার পাশা নামে যার জায়গা দাবি করে খালেক এবং তার অনুসারীরা আমাদের ঝামেলা করছে তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আনোয়ার পাশা বলেছে, আমাদের ক্রয়কৃত জায়গাটি ওনার না।
খালেক এবং দিদারুলের কথার সত্যতা যাচাই করতে এ বিষয়ে কথা হয় আনোয়ার পাশার সাথে। তিনি নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ওই এলাকায় আমার একটি জায়গা আছে। তবে জাহাঙ্গির বা তার সন্তান দিদারদের সাথে আমার জায়গা নিয়ে কোনও সম্পর্ক বা দ্বন্দ্ব নেই। আমি তাদের ঠিকমত চিনিও না। আমার জায়গা নিয়ে ইসমাইল এবং তার পিতা রফিকুল ইসলামদের সাথে বিভেদ চলছে।
আনোয়ার পাশ বলেন, আব্দুল খালেক নামে বায়েজিদ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের কাউকে চিনেন না। এবং তিনি এনসিসি ব্যাংকের পরিচালক বা লন্ডন প্রবাসীও না। তিনি বলেন, ‘আমি একজন শ্রমিক। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ করি।’
এদিকে, স্বেচ্ছাসেবক দলের বায়েজিদ থানার সদস্য সচিব খালেকের বিরুদ্ধে সেলিম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে খালেক বলেন, ‘এটা একটা ষড়যন্ত্র। ঘটনাস্থলে সেলিমের পারিবারিক বিষয় নিয়ে একটা বিচার-সালিশ চলাকানি আমি সেখানে গিয়ে বসি চা খাওয়ার জন্য।’ যারা বিচার-সালিশ করছে তারা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছে। পরে আবার সেই স্ট্যাম্পে ঘটনার বিবরণ লেখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বেচ্ছাসেবক দলের এই নেতার বিরুদ্ধে চাঁদার টাকা গোনার একটি ভিডিও ফুটের সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘ওই টাকাগুলো একটি জায়গা বিক্রির টাকা। আমি একটি জায়গার ব্রোকারি করা পর ওই টাকাগুলো আমি পেয়েছিলাম।’
নাগরিক পত্রিকাকে টাকার বিষয়ে এমন তথ্য জানালেও আরেকটি ভিডিও ফুটেজে ওই টাকাগুলো মোটরসাইকেল বিক্রির টাকা বলে দাবি করা হয়েছিল।
স্থানীয় এক ব্যক্তি না প্রকাশ না করার শর্তে নাগরিক পত্রিকাকে জানান, ৫ আগেস্টর পর থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা খালেকের অত্যাচারে এলাকার লোকজন অসহায় হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
জানতে চাওয়া হলে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহবায়ক – নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, দলের পরিচয় দিয়ে কেউ অপকর্মে জড়িত হলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, খালেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, বিষয়টি চট্টগ্রাম নগর কমিটিকে জানান। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে আমার কাছে প্রতিবেদনটি পাঠান। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করলে কাউকে ছাড়া দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
জাহাঙ্গির আলম পাঠানো অভিযোগটি এখন তিনি পাননি বলে জানান।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.