ইন্টারনেটে ছবি ফাঁসের ব্ল্যাকমেইল: ফাঁদে পড়া নারীদের আর্তনাদ, তদন্তে প্রশাসন

 নিজস্ব প্রতিনিধি
আপডেট: ২০২৬-০৮-২৪ , ০৫:৫৫ পিএম

ইন্টারনেটে ছবি ফাঁসের ব্ল্যাকমেইল: ফাঁদে পড়া নারীদের আর্তনাদ, তদন্তে প্রশাসন ছবি: নাগরিক পত্রিকা

সিলেটে তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও কথোপকথন সংগ্রহ এবং পরবর্তীতে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফ্রান্সে অবস্থানরত এক ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব ও বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তরুণীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন। সম্পর্কের সময় বিভিন্ন ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও কথোপকথন সংগ্রহের পর সম্পর্কের অবনতি হলে সেসব ব্যক্তিগত উপকরণ ব্যবহার করে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা, মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি এবং ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সিলেটের শাহপরান (রহ.) থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরিতে এমন অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন এক তরুণী। ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, সম্পর্কের একপর্যায়ে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ থাকলেও পরবর্তীতে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর অভিযুক্ত তার ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও কথোপকথন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ বা প্রচারের মাধ্যমে তাকে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও আইডির মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও এবং তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে সিলেট জেলা জামায়াতের আমিরের ভাতিজা হিসেবে পরিচয় বা দাবি করেছেন। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কয়েকটি ফেসবুক পেজ নিয়েও অভিযোগ:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, Doinik Kamal Bazar, Crush Confession Sylhet 0.2 এবং Doinik Boroikandi নামের কয়েকটি ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণীদের ব্যক্তিগত বিষয়, ছবি ও ভিডিও নিয়ে পোস্ট করা হচ্ছে। এসব পোস্টের মাধ্যমে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা ও মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের কাছে সংশ্লিষ্ট পোস্ট, পেজের লিংক, স্ক্রিনশট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পোস্টগুলো কার মাধ্যমে, কী উদ্দেশ্যে ও কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে—তা তদন্তের বিষয়।

মৌলভীবাজারেও একই ধরনের অভিযোগ:

এদিকে মৌলভীবাজারের জুড়ী থানায় করা আরেকটি লিখিত অভিযোগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ওই অভিযোগে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, কথা বলার সময় তার কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে তার কাছে অর্থ দাবি করা হয় এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠানো এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও যোগাযোগের তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়।

ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত দাবি:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সময় বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে পরবর্তীতে সেগুলোকে হয়রানি ও চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে অনেক তরুণী সামাজিক অপমান, পারিবারিক চাপ ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তারা দাবি করেছেন।

ভুক্তভোগীরা চান, তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ ও প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করা হোক। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ, আইডি ও ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ, প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ গুরুতর বিষয়। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সাইবার ইউনিটের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ বিভাগ): মোঃ আকতার হোসেন নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, ভুক্তভোগিদের অভিযোগের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ-ক্রাইম): মোঃ মনজুরুল আলম নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, এমন কোনও অভিযোগ থাকলে থানায় লিখিতভাবে জানাতে বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সবাইকে সচেতন হতেও অনুরোধ করেন।