বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা ও বাস্তবতা

প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ ও আমেরিকার উন্নয়ন

 আব্দুস সালাম হাওলাদার l ওহাইও প্রতিনিধি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
আপডেট: ২০২৬-০৩-০১ , ০৮:৪৭ এএম

প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ ও আমেরিকার উন্নয়ন ছবি: নাগরিক পত্রিকা

তুষারে ঢাকা দীর্ঘ শীতকাল, হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা আর বৈরী প্রকৃতিইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর জন্য এই দৃশ্যপট নতুন কিছু নয়। অথচ এই চরম প্রতিকূলতাকে জয় করেই তারা আজ বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

বিপরীতে, সুজলা-সুফলা ও উর্বর মাটির দেশ বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নের মহাসড়কে তার পূর্ণ সম্ভাবনা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পশ্চিমা বিশ্বের এই 'অদম্য' মডেল কতটুকু প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিশ্লেষণ।

প্রকৃতি যেখানে বাধা, প্রযুক্তি সেখানে হাতিয়ার

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক দেশে বছরের প্রায় ৬ মাস কৃষি বা স্বাভাবিক যোগাযোগ স্থবির হয়ে থাকে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই তাদের উদ্ভাবনের পথে ঠেলে দিয়েছে। ১৭৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে শুরু হওয়া শিল্প বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে, ভূ-প্রকৃতি নয়, বরং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনই অর্থনীতির ভাগ্য বদলাতে পারে।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, জার্মানি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো এখন 'স্মার্ট ইনডোর ফার্মিং' এবং 'এআই-চালিত লজিস্টিকস' ব্যবহার করে মাইনাস তাপমাত্রাতেও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখছে। তাদের এই উন্নতির মূলে রয়েছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট। দীর্ঘ সময় ধরে ৬.৪% গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ২০২৬ সালে এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশটি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উর্বর মাটি দিয়ে ২০৩০ বা ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়সমূহ: ১. দক্ষ মানবসম্পদের অভাব: দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে এখনো দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়নি। কারিগরি শিক্ষার চেয়ে তাত্ত্বিক শিক্ষায় গুরুত্ব বেশি হওয়ায় শিল্প খাতের চাহিদার সাথে দক্ষতার অমিল (Skill Mismatch) প্রকট। ২. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাব অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ৩. পরিকল্পনার প্রয়োগ: অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে সাময়িক সমাধানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পশ্চিমা মডেল থেকে যা শেখার আছে

ইউরোপ ও আমেরিকার উন্নয়ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা প্রকৃতির অনুকূল হওয়ার অপেক্ষা করেনি। বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে তিনটি প্রধান শিক্ষা হতে পারে:

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D): শুধু প্রযুক্তির আমদানিকারক না হয়ে উদ্ভাবক হওয়া।

শিল্পের বহুমুখীকরণ: শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং ও ব্লু-ইকোনমিতে জোর দেওয়া। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সাইকেল ও ড্রোন যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে ইউরোপের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।

জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো: পশ্চিমা দেশগুলো যেমন তুষারপাত মোকাবিলায় অবকাঠামো বানিয়েছে, বাংলাদেশকে তেমনি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় টেকসই ও স্মার্ট অবকাঠামো গড়তে হবে।

মানসিকতার পরিবর্তনই কি মূল চাবিকাঠি?

উন্নয়ন কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ফল। প্রতিকূল আবহাওয়ায় যদি পশ্চিমারা বিশ্ব শাসন করতে পারে, তবে অনুকূল পরিবেশে বাংলাদেশ কেন নয়? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের মানবসম্পদকে সম্পদে রূপান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মধ্যে।

প্রকৃতি আমাদের সুযোগ দিয়েছে, এখন সময় সেই সুযোগকে সুশাসিত কৌশলের মাধ্যমে সাফল্যে রূপান্তর করার।

'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।