প্রচণ্ড শীতে উপেক্ষিত মানবতা

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৫-১২-২৯ , ০৭:১৫ পিএম

প্রচণ্ড শীতে উপেক্ষিত মানবতা ছবি: নাগরিক পত্রিকা

শীত মানেই উৎসব, আরাম আর উষ্ণ পোশাকএই চিত্রটি কেবল সমাজের এক শ্রেণির জন্যই সত্য। দেশের বিপুলসংখ্যক শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের কাছে শীত মানে নিরব কষ্ট, অনাহার, রোগ আর কখনো কখনো মৃত্যুর প্রতীক্ষা। ফুটপাথ, বস্তি, চরাঞ্চল কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে আজও হাজারো মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে কাঁপছে, অথচ সমাজের প্রভাবশালী অংশ নির্বিকার।

প্রতিবছর শীত আসে। প্রতিবছর সংবাদমাধ্যমে কয়েকদিন অসহায় মানুষের দুর্ভোগের খবর আসে। তারপর সবকিছু আগের মতোই থেমে যায়। শীত চলে যায়, কিন্তু দায়বদ্ধতার প্রশ্ন থেকেই যায়আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি?

শিশু ও বৃদ্ধদের অসহায় বাস্তবতা

একটি শিশুর জন্য শীত মানে শুধু ঠান্ডা নয়এটি তার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। নিউমোনিয়া, ঠান্ডাজনিত জ্বর, অপুষ্টিসব মিলিয়ে শীত শিশুদের জন্য নীরব ঘাতক হয়ে ওঠে। একইভাবে বৃদ্ধদের শরীর ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, খাবার ও চিকিৎসার অভাবে অনেক প্রবীণ মানুষ নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করেন।

এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কথা যাদেরতাদের অনেকেই আজ নিজেদের ক্ষমতা, রাজনীতি আর বিলাসিতায় ব্যস্ত।

ধনীদের বিলাস, রাজনীতিবিদদের ব্যস্ততা

শীত এলেই দেখা যায় পাঁচ তারকা হোটেলে উৎসব, বিদেশ সফর, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ আর ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। অথচ যাদের ভোটে, যাদের শ্রমে এই রাষ্ট্র দাঁড়িয়েতাদের কষ্টের খবর নিতে খুব কম মানুষই এগিয়ে আসে।

রাজনীতিবিদদের জন্য শীত যেন কেবল আরেকটি মৌসুম; কিন্তু একজন ছিন্নমূল মানুষের জন্য এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন। ধনীদের আলমারিতে পড়ে থাকে অগণিত অপ্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র, অথচ রাস্তার পাশে কাঁপতে থাকা শিশুটির জন্য একটি কম্বল জোটে নাএটাই আমাদের সমাজের নির্মম বাস্তবতা।

রাষ্ট্র ও সমাজের দায়

এটি শুধু দয়ার প্রশ্ন নয়এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের নৈতিক কর্তব্য। সরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ হয় ঠিকই, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায় না। প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব, দুর্নীতি ও উদাসীনতা সমস্যাকে আরও গভীর করে।

অন্যদিকে সমাজের বিত্তবান শ্রেণি ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এগিয়ে আসত, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলানো যেত।

মানবিকতা এখন জরুরি

মানবতা কোনো মৌসুমি বিষয় নয়। শীত এলেই যদি আমরা কয়েকটি ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ মনে করি, তাহলে তা কেবল আত্মতুষ্টি ছাড়া কিছু নয়। প্রকৃত সহানুভূতি মানে পরিকল্পিত উদ্যোগ, টেকসই সহায়তা এবং নিয়মিত নজরদারি।

একটি কম্বল, একটি সোয়েটার, একবেলা খাবারএগুলো কারও কাছে তুচ্ছ, আবার কারও কাছে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

শেষ কথা

প্রচণ্ড শীত আমাদের কেবল কাঁপায় নাএটি আমাদের বিবেককেও নাড়া দেয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই নাড়া শুনতে পাচ্ছি? নাকি ক্ষমতা আর ব্যস্ততার আড়ালে নিজেদের মানবিক দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছি?

শীত কেটে যাবে। কিন্তু এই প্রশ্ন থেকে যাবেআমরা কি মানুষ ছিলাম, নাকি কেবল দর্শক?

 

লেখক: প্রফেসর সৈয়দা মঈন

চিফ কান্ট্রি করেসপন্ডেন্ট

নাগরিক পত্রিকা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

'মুক্তমত' বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব ।