এস. এম. মশিউর রহমান
আপডেট: ২০২০-০৮-২২ , ০৯:৩৮ পিএম
ছবি: সিটিজেন নিউজ
শহুরে ব্যস্ততার এক বিশেষ না বোধক দিক হলো এটি মানুষকে যন্ত্রে রূপান্তর করে ফেলে। যার ফলে, ঘড়ির কাঁটার সাথে ছুটে চলা ব্যতীত অন্য উপায় থাকেনা। তথাপিও, আমার মত প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ একটু সুযোগ পেলেই প্রকৃতির পানে ছুটে চলি। কমলদহ ঝর্ণা প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। আমরা মোট এগার জনের দল। যেহেতু একেকজনের বাসা একেক জায়গায় তাই সিদ্ধান্ত হলো আমরা সবাই ঢাকার শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সামনে জমায়েত হবো।
১৩ আগস্ট, ২০২০। পূর্ব নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী রাত এগারোটার মধ্যে সবাই উপস্থিত হলাম। ‘ঘুড়ি...ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম’র ব্যানারে রাত সাড়ে এগারোটায় আমাদের মাইক্রোবাস চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।
হই হুল্লোড় আর আনন্দর মাঝে সময় যে কিভাবে কেটে যাচ্ছিল তা কেউই টের পাইনি। এরই মাঝে আমাদের গাড়ি একটি রেস্তোরাঁর সামনে থামলো। খুব সম্ভবত হোটেল ‘নূরজাহান।’
প্রচন্ড ভীড় থাকায় আমরা একটা কর্ণারে গিয়ে বসলাম। কেউ স্যান্ডুইচ, কেউ পুডিং আবার কেউবা খিচুরি অর্ডার করলো। স্বাদ আর দামের পার্থক্যটা নজড় কাড়ার মত। দামের গ্রাফ যত উপরে স্বাদের মান ঠিক ততোটাই নিচের দিকে ধাবিত। খাবারের রিভিউ কারও কাছ থেকেই ভাল পাওয়া গেলনা।
আবার চলতে শুরু করলো আমাদের গাড়ি। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মসৃণ পিচঢালা পথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ীর দুলুনিতে একেকজন ঘুমের ঘুরে আচ্ছন্ন। গভীর রাতেও এ পথ কতটা ব্যস্ত থাকে তা না দেখলে আফসোস থাকতো।
আমাদের গাড়ী যখন গন্তব্যে পৌঁছলো ঘড়ির কাঁটা তখন রাত চারটার ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ভোর রাতে কে কোথায় যাবে? কী আর করা, সবাই ঘুমাতে লাগলো।
আমাদের এডমিন ততোক্ষণে হোটেলে নাস্তার আগাম অর্ডার দিয়ে এসেছেন। একটার পর একটা গাড়ী এসে জড়ো হচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে, সবাই ট্রেকার। সাড়ে পাঁচটার সময় নাস্তা প্রস্তুত। তুন্দুল রুটি, ডাল আর সব্জি দিয়ে কোন রকমে নাস্তা খেয়ে নিলাম।ভীড়ের কারণে ডিম ভাজি আর পাওয়া গেলনা। এত সকালে আমরা কখনো খেয়ে অভ্যস্ত নই বিধায় একটু সমস্যা হচ্ছিল।
বড় দারোগার হাট থেকে আমাদের গাড়ী বামে ছোট রাস্তা ধরে কমলদহের দিকে যাত্রা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর গোলাপি রংয়ের একটা মসজিদ আমাদের নজড় কাড়লো। রেললাইনের স্টপেজে সবাই নেমে নির্ধারিত একটি হোটেলের টয়লেটে সবাই প্রাকৃতিক কাজ সেরে ট্রেকিং উপযোগী পোশাক পড়ে নিল।
এতক্ষণ যা বলেছি তা কেবলই ভূমিকা। মূল গল্প এখান থেকে শুরু।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই পাওয়া পাহাড়ি ঝিরির ঠান্ডা পানিতে হাঁটতে কি যে ভাল লাগছিল তা কেবল আমরাই বুঝেছিলাম। ছোট ভাই স্বরূপ তানভীর, মিরাজের অনুভূতি শুনে ভাল লাগলো। ফারহান ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই ও নাঈম ভাই বেশ জোরেশোরে হাঁটলেও হাসান ভাই তার স্ত্রীকে নিয়ে কিছুটা ধীরগতির সূত্র ফলো করছিলেন।
এডমিন আতিফ ভাই কিছুক্ষণ পরপর পেছন থেকে কেনডিড পিক তোলায় ব্যস্ত। অনেকগুলো কলাগাছের সারি দেখে বুঝা গেল এখানে কলার চাষ হয়। গল্পের হাঁটতে হাঁটতে ইতিমধ্যে আমরা পানির শব্দ পেলাম। চোখের সামনে "কমলদহ" ঝর্ণা দু'বাহু বাড়িয়ে আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানালো।
নিজের দৈত্যাকার রূপটাকে শুধুমাত্র পর্যাপ্ত পানির অভাবে আমাদের দেখাতে পারেনি। এক পাশের কিছুটা অংশ দিয়ে যেভাবে পানি নহর বইছিল তা দেখেই প্রেমে পড়ে যাচ্ছিল সদ্য আসা কিশোর কিশোরীরা।

মধ্য বয়স্করা তাদের বয়সের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে বাচ্চাদের মত পানিতে ঝাপিয়ে পড়লেন। অতিথি পরায়ণ কমলদহ সবাইকে তৃপ্ত করতে একটুও কার্পণ্য করলোনা। স্বচ্ছ ও শীতল পানির বহর দিয়ে সবাইকে সাধ্যমত আপ্যায়ণ করলো সাথে নিরবে এটাও বুঝিয়ে দিল পর্যাপ্ত পাহাড়ি ঢল নামলে তার আতিথেয়তার চরম প্রদর্শন করতো।
এবার সামনে যাওয়ার পালা। লক্ষ্যস্থল ছাগলকান্দা ঝর্ণা। পঞ্চাশ গজ সামনে গেলে পাহাড়ের উপরে উঠার রাস্তা। দুঃখিত। এটাকে রাস্তা বলে রীতিমত অন্যায়ই করে ফেলেছি বোধ হয়।
পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত পাথুরে এবড়ো থেবড়ো সরু আইলের মত পথ বেয়ে উঠা আর মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করা একই সূত্রে গাঁথা। কোন রকমে পা পিছলে পড়লেই কেল্লাফতে। সোজা শজনেতলায় যেতে হবে। গুরুতর আহত হওয়া তো সামান্য ব্যাপার মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে এই পথ। ঠিক এ কারণেই বোধ হয় সরকারিভাবে এখনো এ জায়গাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
ছেলেরা যেমনতেমন কিছু মেয়েকে তো গলার পানি শুকিয়ে চোখে সরষে ফুল দেখতে দেখেছি। আমাদের জাহাঙ্গীর ভাই পিছলে পড়ে যেতে যেতে দু'হাত দিয়ে পাথুরে মাটি আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হবার ঠিক আগ মুহূর্তে অন্য দলের তিন চারজন ছেলে উনাকে ধরে এবারকার মত উদ্ধার করলেন। উনার অবস্থা দেখে উপরে সিরিয়ালে থাকা আমার প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত প্রায়।
যাক, কোন রকমে নামতে পেরে এবারকার মত শুকরিয়া আদায় করলাম।
দু'পাশে সবুজে ঘেরা পাহাড়ি ঝিরির শীতল পানি মাড়িয়ে সামনে যাচ্ছি আর সৃষ্টিকর্তার অপার সৌন্দর্যের কাছে নিজেদের তুচ্ছতার কথা বিনাবাক্যে স্বীকার করে মাথা নত করছি।
ছাগলকান্দা ঝর্ণায় আবারও ভিজলাম। এমন জায়গায় এলে বেরসিক যে কেউই হয়তো প্রেমের উপাখ্যানও তৈরি করে ফেলতে পারে। ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এখানে সবার একটাই পরিচয় - পর্যটক। তার উপর আবার ট্রেকার। একসাথে ঝর্ণার পানিতে নিজেদের সাড়া অঙ্গ ভিজিয়ে নিতে বদ্ধ পরিকর।
সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী আমাদের এডমিন আরেকজনের সাথে গানে সুর মেলালেন - বকুল ফুল বকুল ফুল, সোনা দিয়া হাত কেন বান্দাইলি। ওদিকে আবার একদল ঝর্ণায় ভিজতে ভিজতে "কালার সঙ্গে পিরীত কইরা সুখ পাইলামনা সখি গো, ও আমার মন ভালানা" গানে মাতিয়ে দিলেন।
আমাদের হাসান ভাই ওই রকম ঝর্ণার পাড়ে তার স্ত্রীর শাড়ি পড়া ছবি উঠিয়ে স্মৃতিগুলোকে ক্যামেরা বন্দি করায় ব্যস্ত থাকলো আর আমরা চলতে শুরু করলাম "পাথর ভাঙ্গা" ঝর্ণা উদ্ধারে।
সামনের ইংরেজি অক্ষরের মত ‘Y’ জংশন থেকে বাঁ দিকে চলা শুরু করলাম। পাহাড়ি বুনো ফুল ও জীবন্ত শামুকের অপরূপ দৃশ্য দেখছি আর সামনে হাঁটছি। বলে রাখা দরকার, এ পথে ঝর্ণার পাশাপাশি বেশ কয়েকটা ক্যাসকেডও রয়েছে।
পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা ঝিরিপথের বুক চিড়ে হাঁটতে হাঁটতে সবুজের এক অপার সৌন্দর্য অবলোকন এ যাত্রার মাহাত্য বাড়িয়ে দিয়েছে আরো অনেক গুণ। এডমিন আমাদের মাঝে হালকা শুকনো খাবার বিতরণ করলেন। খেজুর, কেক, বিস্কিট, প্রাণের আমসত্ত্ব খেয়ে ক্ষুধাকে আপাতত ছুটি দিলাম।
রূপসী অথবা রংধনু কী যেন নাম তার! ঝর্ণাটার ভুলে যাওয়ায় দুঃখিত। আমরা ভেবেছিলাম, এটাই শেষ মাথা। তাই শেষবারের মত ঝর্ণায় গোসল করে নিচ্ছিলাম। ভিজতে ভিজতে হঠাৎ এডমিন ডাকলো উপরে উঠতে। সবাই উপরে উঠে চিৎকার দিয়ে উঠলো। অবশ্য এমন দৃশ্য দেখে শুধুমাত্র বেরসিক মানুষই বোধ হয় চুপ থাকতে পারে।
চিকন ও দু'নলা অত্যন্ত উঁচু এ ঝর্ণাটি দেখার পর সবাই বিস্ময়ে হতবাক। সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ পাহাড়ি জনপদ। এর আনাচে কানাচে কেবলই মায়া আর মায়া। এ রকম পরিবেশে বাড়তি পাওয়া এ ঝর্ণাটি প্রকৃতিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঝর্ণার নিচে জমে থাকা পানিতে দৌড়ে ঝাপিয়ে পড়ে এ প্রকৃতির প্রতি নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।
গোসল, হইচই আর প্রচুর ছবি তোলার মধ্য দিয়ে শেষ হলো আমাদের এবারকার মত ঝর্ণা অভিযান। সামনে হাঁটতে গিয়ে একবারও পিছনে তাকাচ্ছিনা। তাহলে এ মায়াময় পরিবেশ আজ আর ফিরতে দিবেনা। ফিরতি পথের দিকে যতই এগুচ্ছি বুকের ভিতরের ধুকধুকানি ততোই বাড়ছে। কারণ, সামনে আছে পথের রূপ ধারণ করে থাকা এক মৃত্যুকূপ। যার ‘পদে পদে বিপদ’।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.