বাংলাদেশি মেয়েদের কাজের প্রলোভনে অনৈতিক কাজে জড়ানোর অভিযোগ

 দুবাই থেকে ফিরে, রোমান শেখ
আপডেট: ২০২০-০৩-০২ , ১২:২৬ পিএম

বাংলাদেশি মেয়েদের কাজের প্রলোভনে অনৈতিক কাজে জড়ানোর অভিযোগ ছবি: প্রতীকী

বাংলাদেশি মেয়েদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়ার পর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ ধরনের মানবপাচারের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু অসাধু দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির কারণে দেশের অভিবাসন খাত আজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

রাজধানীর দক্ষিণখানের বাসিন্দা রূপা (ছদ্মনাম) দুবাইর নাইফ পুলিশ স্টেশন এলাকার একটি ফ্লাটে ভাড়া থাকেন। তার সাথে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি মেয়ে সেখানে একত্রে বসবাস করে। রূপা বলেন,“আমাকে বলা হয়েছিল, একটি বিউটি পার্লারে কাজ পাবো। মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন দেবে। কিন্তু দুবাই পৌঁছানোর পর আমার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হলো। এরপর জোর করে এমন কাজে বাধ্য করা হলো যা আমার কখনোই করার কথা ছিল না। না চাইলে শারীরিক নির্যাতন করা হতো।”

রূপার সাথে একই ফ্লাটে থাকেন এমন একজন নরসিংদীর মেয়ে মায়া (ছদ্মনাম) জানান, স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসেন। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল হাউসকিপারের চাকরির। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে রাতের পর রাত জোরপূর্বক যৌন কাজে পাঠানো হয়। বিভিন্ন ডান্সবারে তাকে নচতে বাধ্য করা হয়। তিনি বলেন, দেশে থাকা পরিবার সদস্যদের সাথেও যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই। তারা আমাদের সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণে এবং নজরদারিতে রাখে। কোনও ধরনের মোবাইল ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দালাল চক্রগুলো প্রথমে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোকে টার্গেট করে। তারা মেয়েদের পরিবারকে বোঝায়-বিদেশে গেলে সংসারের অভাব ঘুচবে, মাসে মোটা অঙ্কের টাকা আসবে। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়েই এসব তরুণীকে বিদেশে পাঠানো হয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন-
“দালালরা ভুয়া চুক্তিপত্র দেখিয়ে মেয়েদের বিদেশে পাঠাচ্ছে। অনেক সময় রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গেও তাদের যোগসাজশ থাকে। বিমানবন্দরে ভুয়া তথ্য দিয়ে যাত্রীদের পাঠানো হয়। এ কারণে নজরদারির বাইরে চলে যাচ্ছে।”

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় এ প্রতারণা। বৈধ কাগজপত্র দেখালেও বাস্তবে কাজের চুক্তি থাকে ভুয়া। ভুক্তভোগীরা জানান, বিদেশে পৌঁছানোর পরপরই পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। ফলে তারা আর ফিরে আসার পথ খুঁজে পান না।

ঢাকার বনানীর মানবাধিকার সংগঠনের এক সদস্য বলেন-
“এটি সরাসরি মানবপাচারের অংশ। মেয়েদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক কাজে নামানো হয়। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।”

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই এ ধরণের অভিযোগ আমলে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বেশ কয়েকজন নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু ফেরত আনা সমাধান নয়; মূল দালাল চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

অভিবাসন ব্যুরোর পরিচালক (অপারেশনস)বলেন “আমরা মানবপাচার চক্রগুলোকে চিহ্নিত করেছি। বিশেষ অভিযানে কয়েকজন দালালকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ধরা সহজ নয়। এর জন্য আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা দরকার।”

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. মাহবুবা হক বলেন-“প্রতারণার শিকার মেয়েদের বেশিরভাগই আসছেন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের আর্থিক দুরবস্থাকে পুঁজি করেই চক্রগুলো কাজ করছে। বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যম ছাড়া কাউকে বিদেশে পাঠানো হলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমবে।”

আমাদের প্রতিনিধি ছদ্মবেশে এমন সংবাদ সংগ্রহে বিভিন্ন হোটেল এবং ডান্সবারে যান। সেখানে কৌশলে কিছু ভূক্তভোগি মেয়েদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। কয়েকজন মেয়ে তার কাছে মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি তা দিতে সক্ষম হন এবং তাদের সমস্যার কথা জানাতে চান।

আমাদের প্রতিনিধি গত ২৮ জানুয়ারি নাইফ পুলিশ স্টেশন (দুবাই) পরিদর্শনে। সেখানে ওয়েটিং রুমে কান্না করছে ১৯/২০ বছরের এক বাঙালি সুন্দরী তরুণী। কান্নার কারণ জানতে চাইলেন আমাদের প্রতিনিধি। বাঙলা কথা শুনে মেয়েটি আঁতকে ওঠে। তার সাথে সেখানে কথা বলার চেষ্টা করা হলে সেখানকার কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য তাতে বাঁধা দেন। ফলে, আমাদের প্রতিনিধি তার মোবাইল নাম্বার দেন।

পরের দিন ২৯ জানুয়ারি স্বপ্না (ছদ্মনাম) আমাদের প্রতিনিধির মোবাইলে ফোন করেন এবং তিনি তার সাথে দেখা করতে চান বলে অনুমোতি চাইলেন। পরে একইদিন বিকালে আমাদের প্রতিনিধির সাথে স্বপ্না দেখা করেন এবং তার দুবাই জীবন সম্পর্কে ভয়াবহ এক বর্ণনা দেন।

তিনি জানান, গত, ৪ নভেম্বর ঢাকা থেকে দুবাই পৌঁছে সন্ধ্যা ৬টার দিকে। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো-‘রয়েল ফ্যালকন’ নামক হোটেলে। রাত ৮টায় শুরু হয় তার ওপর যৌন নির্যাতন। শেষ হলো ভোর রাতে! আটকে রাখে ১টি রুমে। পরদিন রাত ৮টায় বাধ্য করে নাচে নাচে দর্শকদের মন-শরীর মাতাতে!

চলে ভোর ৪টা পর্যন্ত। মেয়েটিকে পছন্দ হয় কয়েকজনের! কিন্তু যিনি বেশি টাকা হাঁকালেন তার হাতে তুলে দেয়া হয় আগামি ১০ ঘন্টার জন্য।

নারায়গঞ্জ বাড়ি তার। দু’বোনের বড় তিনি। বাবা বয়স্ক; সিএনজি অটোরিক্সা চালায়। ভালো বেতনের প্রলোভন ছিল। নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে বিবিএ ১ম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে চলে আসে দুবাই। বড় মেয়ে তাই, বাবার কষ্ট দেখে উপর্জনের সঙ্গী হতে চেয়েছিল। কিন্তু দালালের পাল্লায় পড়ে তার জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়-বলেন স্বপ্না।

আমাদের প্রতিনিধি রোমান শেখ প্রবাসি বাঙালিদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলার জন্য দেখা করতে চেয়েছি কনস্যুল জেনারেলের মি. ইকবাল হোসেন খানের সাথে। স্বাগত জানালেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় এক বৈঠকের আয়োজন করেন কনস্যুল জেনারেলের মি. ইকবাল হোসেন খান।  কথার এক পর্যায়ে ভূক্তভোগি মেয়েটির কথা জানানো হলো। নিলেন মেয়েটির মোবাইল নাম্বার। সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেন।

জানুয়ারি ৩১। ‘রয়েল ফ্যালকন’ হোটেল থেকে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু ধরা খায় মেয়েটি। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায় আরও। সন্ধ্যায় মেয়েটির হঠাৎ ফোন। চিৎকার করে কান্না করছিলেন তিনি। তাকে বাঁচাতে অনুরোধ করা হয়। তার আশপাশে কেউ আছে কি-না জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বললো হোটেল মালিক পারভেজ আছে।

হোটেল মালিক পারভেজের সাথে দীর্ঘ ১৫ মিনিট কথার শেষে মেয়েটিকে ছেড়ে দিতে পারভেজকে অনুরোধ করা হয়। নয়তো পারভেজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হবে- এমন কথায় পারভেজ আমাদের প্রতিনিধিকে কথা দিয়েছেন, শনিবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাবে।

কিন্তু দালালদের এমন কথায় আমাদের প্রতিনিধি আশ্বস্ত হতে পারেনি বলে কনস্যুল জেনারেলের মি. ইকবাল হোসেন খানের সাথে আবারও তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। কয়েক দফায় কথা বলতে গিয়ে তখন রাত ৩টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। মেয়েটিকে উদ্ধারে সব চেষ্টা চলছে। কনস্যুল জেনারেল প্রস্তুতি নিলেন ওই রাতেই বন্দী মেয়েটিকে উদ্ধারে অভিযান চালাবেন।

এরই মধ্যে কনস্যুল জেনারেলের মোবাইলে একটি ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটি করেছেন হোটেল মালিক পারভেজ। তিনি কনস্যুলারকে নিশ্চিত করেন যে, শনিবার দুপুর ১২:১০ মিনিটে বাংলাদেশের উদ্দেশে মেয়েটির  ফ্লাইট। আমাদের প্রতিনিধি টিকেটের ছবি চেয়ে নিশ্চিত করতে বললে তিনি টিকেটের ছবি পাঠিয়ে নিশ্চিত করেন।

রবিবার রাতে স্বপ্নার বাবার নাম্বারে ফোন করে তার মেয়ে ফিরেছেন কিনা জানতে চায় আমাদের প্রতিনিধি। স্বপ্নার বাবা ফোনটি স্বপ্নাকে দেন এবং স্বপ্না নিশ্চিত করেন যে, দেশে ফিরেছেন এবং তাদের পরিবারের সাথেই আছেন।  

পরে আমাদের প্রতিনিধির সাথে আরও কয়েকজন ভূক্তভোগি মেয়ে যোগাযোগ করেন। যাদের মোবাইল নাম্বার কনস্যুলারকে দিয়ে তাদের আইনী সহায়তা দিতে অনুরোধ করা হয়।

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন।