কেওক্রাডং বিজয়ের গল্প (পর্ব ০১)

 এস. এম. মশিউর রহমান
আপডেট: ২০২০-১০-২৮ , ০৮:৩১ পিএম

কেওক্রাডং বিজয়ের গল্প (পর্ব ০১) ছবি: সিটিজেন নিউজ

কর্ম ব্যস্ততার শহর ঢাকা যেখানে জীবন চলে ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে যন্ত্রের গতিতে। সেই ব্যস্ততা আরও শাণিত হয় যদি সেটি হয় বায়িং হাউজের চাকরী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস, শুক্র-শনিবারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ এর ক্লাশ, রাতে বাসায় ভ্লগিংয়ের ভিডিও এডিটিং। পারিবারিক ও সামাজিক অন্যান্য কাজ তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে জীবনটা যেন এক দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাই একঘেঁয়েমি ও বিস্বাদ কাটাতে প্রায়শই ছুটে যাই প্রকৃতির কোলে ভ্রমণ করতে।

শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করার প্রাকৃতিক এক মহৌষধের নাম হলো ভ্রমণ। তবে কিছু ভ্রমণ শরীরের সহ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা নেয়ার পর আপনাকে যা উপহার দেবে তা সারা জীবন মনে রাখার মত।

ছোটবেলায় মায়ের কোলে শুয়ে থাকতে না পারায় জীবনে যে গভীর শুন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকৃতি তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করে। কেন যেন ছোটবেলা থেকে বাড়ির বাইরে থাকা নিজেকে প্রকৃতির সন্তান বলেই মনে হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলাম নেপালে। সেখানকার পাহাড়গুলোও সুন্দর। তবে এতটা নয়, যতটা সুন্দর আমাদের বান্দরবান। 

প্রকৃতির হাতছানিতে এবার ছুটে গিয়েছিলাম বান্দরবানে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী "ঘুড়ি ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস"র সাথে ১৭ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে অফিসের কাজ শেষে সিএনজি নিয়ে সোজা চলে গেলাম ফকিরাপুল আইডিয়াল হোটেলের নিচে হানিফের এক নাম্বার কাউন্টারে। ঢাকা থেকে বান্দরবান নন এসি বাসে ৬২০ টাকা ভাড়া। রাত ৯ঃ৩০ টায় একটি ছোট গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো যাত্রাবাড়ীতে। সেখান থেকে মূল বাসে উঠলাম। সুপারভাইজার সব যাত্রীর আগমন নিশ্চিত করার পর মহান আল্লাহর নাম নিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মসৃণ পথে অভিজ্ঞ ড্রাইভার গাড়ী চালানোতে মনে হচ্ছিল যেন গাড়ী নয় বিমান অথবা লঞ্চে চড়েছি। কুমিল্লায় নূরজাহান হোটেলে যাত্রাবিরতি শেষে আবার ছুটে চলা। 

গাড়ীতে সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমি তখন মহাসড়কে রাতের যান্ত্রিক ব্যস্ততা দেখে চোখ জুড়াই।

রাত সাড়ে চারটায় বান্দরবানে পৌঁছলাম। বঙ্গবন্ধু চত্বরের সামনে নেমে সবাই আড়মোড়া ভাঙা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর পর নিশ্চুপ শহরে একের পর এক পর্যটকের গাড়ী এসে থামছে আর ভ্রমণ পিপাসুরা জড়ো হচ্ছেন। 

পূর্ব নির্ধারিত চান্দের গাড়ী এসে থামলে আমরা সবাই উঠে পড়লাম। ছোট একটা উটকো ঝামেলা তৈরী হলো। গাড়ীতে তেল না থাকায় পাম্পে ঢুকলো তেল নিতে। কিন্তু পাম্প বন্ধ। লোকজন ঘুমাচ্ছে। জানালা দিয়ে ম্যানেজারকে আমরা সবাই ডেকে ডেকে ক্লান্ত হই কিন্তু বেচারার ঘুম আর ভাঙেনা। অবশেষে স্থানীয় এক যুবক এসে অনেকক্ষণ ডেকে তাকে ঘুম থেকে উঠালো। এরপর ম্যানেজারের কথার প্রেক্ষিতে যখন জানলাম সে এতক্ষণ জেগেই ছিল কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে তেল সরবরাহ করবেনা তখন আমাদের চোখ তো কপালে উঠার যোগাড়!

আমাদের ড্রাইভারের সাথে তার মোটামুটি একটা বাক-বিতন্ডা শেষে গাড়ী ছোটে চললো। বেচারা ড্রাইভারের মন খারাপ থাকায় পুরোটা রাস্তায় আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হলো। উঁচু-নিচু এবড়ো থ্যাবড়ো পাহাড়ী পথে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ী চালালে পিছনের যাত্রীদের কি অবস্থা হয় তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।

আদিবাসীরা মাথার পিছনে বহন করা যায় এমন এক ধরণের ঝুড়ি নিয়ে দল বেঁধে কাজে যাচ্ছেন। পাহাড়ের টিলার উপর ছোট ছোট ঘরবাড়িগুলো অনেকটা দেখতে ঠিক পাখির বাসার মত। ভ্রমণে ভাল লাগার প্রথম আবেশটা শুরু হলো "মিলনছড়ি" ভিউ পয়েন্টে গাড়ী থামার পর। সূর্যটা কেবল উঠতে শুরু করেছে। হালকা রঙিন আভার সাথে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘের বিচরণ দেখে মনে হলো আমরা এখন সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবনে আছি। ছবি তোলার কাজ সেরে আমরা আবারও সামনের দিকে এগুতে শুরু করলাম।

 

পথে দুই জায়গায় আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী যাবতীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করা হলো। রুমা বাজারে পৌঁছানোর পর দেখা হলো আমাদের গাইড আলমগীর ভাইয়ের সাথে। তিনি ২০০৪ সাল থেকে এই ট্রেকে গাইড হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বগালেক ট্যুরের যত গাইড আছেন আলমগীর ভাই তাদের মধ্যে সব থেকে জনপ্রীয়। তার সাথে তিনদিন থাকার পর জনপ্রীয়তার রহস্য উদঘাটন করলাম। অমায়িক ব্যবহার, স্থানীয় প্রতিটি জায়গার বিস্তারিত বিবরণ, পর্যটক বান্ধব, সকল দোকানদার, স্থানীয় আদিবাসি ও সেনাবাহিনীর কর্তাদের সাথে তার সখ্যতাই তাকে সেরাদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

রুমা বাজার সেনা ক্যাম্পে নাম ও বিস্তারিত পরিচয় লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাদকতা রয়েছে। কারও কারও কাছে এই প্রক্রিয়াগুলো কিছুটা বিরক্তির কারণ হলেও সচেতন মহলের কাছে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের মূল্য অপরিসীম। যেহেতু পার্বত্য অঞ্চল এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়, যেহেতু পাহাড়ে বিদ্রোহি সংগঠনের কর্মীরা এখনও সোচ্চার দেশকে অরাজক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়ার জন্য, সেহেতু নিরাপত্তা বাহিনীর এরকম কর্মতৎপরতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

রুমা বাজারে সবাই মিলে নাস্তা করলাম আল মদিনা হোটলে। ছোট একটা হোটেল। গ্রাম্য একটা আবহ বিরাজ করছে। পুরোপুরি পর্যটক নির্ভর এ বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিসের সবকিছুই পাওয়া যায় অত্যন্ত সুলভ মূল্যে।

রুমা উপজেলা পুলিশ ফাঁড়ি পার হওয়ার পর রাস্তার দু'ধারের বৃক্ষসমারোহ দেখে আমরা মুগ্ধ, অভিভূত। মনে হচ্ছিল, আমরা আসবো দেখে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গাছপালাগুলোকে সবুজে সাজানো হয়েছে। সবুজ যে এতটা সবুজ হতে পারে তা না দেখলে বুঝানো কঠিন। উঁচু-নিচু পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আমাদের চান্দের গাড়ী ঘুরে আর আমরা রোমাঞ্চিত হই। আনন্দে মৃদু চিৎকার চেঁচামেচিও চলে হরদম। পাহাড় বেয়ে গাড়ী উপরে উঠার সময় গতি যেমন স্তিমিত, নামার সময় ঠিক তেমনই প্রবল। স্টিলের তৈরী ব্রিজগুলো যখন পার হয় তখন ঝনঝনাঝন শব্দে মন দুলে ওঠে। পাহাড়ের গা থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে আসা একেকটা ফুল ড্রাগন ফলের মত দেখতে। লাল টকটকে সে ফুলে প্রজাপতিরা মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাড়ির একপাশে বসায় অন্যপাশের সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলাম বিধায় উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। চান্দের গাড়ির ছাদ খোলা, তাই শুধু লোহার রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকিও রয়েছে। তবে আনন্দ আর উন্মাদনার মাঝে সে ঝুঁকি পাত্তাই পায়না। 

আমাদের গাড়ি একটি ভিউ পয়েন্টে এসে থামলো। উপর থেকে নিচে পাহাড়ের বিছানার অভাবনীয় সুন্দর দৃশ্য যেকোন বেরসিক মানুষকেও ভাবিয়ে তুলতে সক্ষম। আমাদের গাড়ী উপরে উঠে আর নিচে নামে। মাঝে মাঝে শূন্য ডিগ্রী বাঁকে একেকজন কাত হয়ে পড়ে যাবার উপক্রম হই। খানাখন্দে ভরা সে পথের ঝাকুনিতে একেকবার মনে হয় শরীরের সবগুলো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এই বুঝি আলাদা হয়ে যায়। এভাবে প্রকৃতির রোলার কোস্টারে চড়তে চড়তে তিনটা চারটা ভিউ পয়েন্টে থামা ও প্রকৃতি দেখে তৃষ্ণা নিবারণ করে ইতিমধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম বগালেক। 

ক্লান্তিভরা চোখ জুড়িয়ে গেল মুহুর্তে। সমুদ্র থেকে প্রায় এক হাজার ৭০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় ১৫ একর জায়গার এ রকম লেক বাংলাদেশের আর কোথাও মিলবে না। এই লেকটি তৈরি হয়েছিল একটি মৃত আগ্নেয়গিরির পানি চুয়ে চুয়ে। আবার কারও কারও মতে কোন এক ড্রাগনের মুখের অগ্নিশ্বাষ থেকে এ লেকের উৎপত্তি। তাই অনেকে একে ড্রাগন লেকও বলে থাকেন। আরেকটে পক্ষ আবার আকাশ থেকে আসা উল্কা পিন্ডের আঘাতে এটি তৈরী হয়েছে বলেও মতামত দিয়ে থাকেন।

আর্মি ক্যাম্পের সিগনালটা পার হওয়ার সাথে সাথে চোখে পড়লো সবুজে ঘেরা শান্ত সুনিবিড় এক বৃহৎ জলাধার চুপচাপ শুয়ে আছে। যার রূপের ঝলকানিতে বারবার ব্যর্থ প্রেমিকও আবার প্রেমের কথা ভাবতে শুরু করবে। প্রকৃতি তার দু'হাত উজাড় করে এখানে রূপের ঢালি সাজিয়ে রেখেছে। মনে হয় কোন এক রূপের দেবী কোন রকমের শ্রেনিবৈষম্য না করে সবার জন্য তার ভালবাসার দ্বার উন্মুক্ত করে রেখেছে। আকাশের নীল রঙকে নিজের মাঝে ধারণ করে সে দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে এমন মায়াবী রূপবতী লেক এরকম নিশ্চুপ পরিবেশে নিজেকে গুটিয়ে রেখে কি শান্তি পায়, তা আমার বোধগম্য নয়। 

লেকের নির্দিষ্ট এক কর্ণারে গোসল করে এবার আমাদের খাবারের পালা। রুমা বাজার থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত এই পাহাড়ি অঞ্চলে আপনার যা ইচ্ছা তা পাওয়ার আশা করাটা এক ধরণের উঁচু মাত্রার বিলাসিতা। তবে পাহাড়ি জুম চাষের চালের ভাত, মুরগির মাংস, আলু ভর্তা ও সব্জি দিয়ে পেটপুরে ভাত খেয়ে যে তৃপ্তি পেয়েছি তা দীর্ঘদিন মনে থাকবে নিশ্চিত। ঝর্ণার পানি যে এতটা কোমল ও ঠান্ডা তা আমার ধারণার বাইরে ছিল।

খাওয়া-দাওয়ার পর এবার বগালেক পাড়াটা একটু ঘুরে দেখা যাক। বোম উপজাতিদের বসবাস এখানে। পর্যটকদেরকে খুব সহজেই আপন করে নেয় এরা। বেশ গোছানো ও পরিপাটি করে সাজানো এ পাড়া। মাধবী ফুলের ঝোপ ও বড় বড় জবা ফুলের মন মাতানো রঙ এই পাড়ার বসতিদের রুচির পরিচয় বহন করছে। ঘরগুলো এমনভাবে সাজানো যে পিছনে মানুষের বসবাস আর সামনে দোকান। সেসব দোকানে চায়ের আড্ডা চলে হরহামেশা। সেই কফি হাউজের গানের মত প্রতিদিন কত অচেনা পর্যটকের ভীড়ে মুখরিত হয় এ বগালেক।

এবার পাড়ার শেষের দিকটায় আমরা। এখানকার বসবাসকারীগণ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত। এখানে রয়েছে এ পাড়ার একমাত্র চার্চটি, যা বিভিন্ন ফুলের গাছ দিয়ে ঘেরা।

এডউয়িন রওল্যান্ডস এর আবক্ষ মূর্তি বিশিষ্ট একটি মিনার রয়েছে চার্চের ঠিক পাশেই। নিশ্চয় এই ভদ্রলোক অত্যন্ত স্মরণীয় ব্যক্তি এখানকার মানুষদের কাছে। পরে জানতে পারলাম, চট্রগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী  বোম উপজাতীদের কাছে ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে সর্বপ্রথম তিনিই এখানে খ্রীস্টান ধর্মের দীক্ষা

নিয়ে আসেন। শুনে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে এই বিখ্যাত গুরুজনের প্রতি। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করলাম কিছুক্ষণ। 

এতক্ষণ পুরো বগালেক পাড়া ঘুরে ঘুরে সনি ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করায় সবার নজরে চলে আসলাম। কেউ কেউ নিজ থেকে এসে আমার ইউটিউব চ্যানেলের নাম জিজ্ঞেস করছিল।

লেকের দক্ষিণ দিকটা আরও বেশি শান্ত। পর্যটকদের জন্য বসার চমৎকার ব্যবস্থা করা আছে। এখানে বসে সূর্যোদয়ের দৃশ্য উপভোগ করলাম। শেষ বিকেলের লাল সূর্য আস্তে আস্তে পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়লো আর জানিয়ে দিল যে, আজকের মত আরও একটি দিনের সমাপ্তি। 

কোথা থেকে এসে যেন একটি বিষ পিঁপড়া গলায় এমনভাবে কামড়ে দিল যে এর ব্যথা আমাকে দুদিন পোহাতে হয়েছে। 

এখানকার দোকানগুলোতে জাম্বুরা, কলা, পানি ফল, কমলাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ফল পাওয়া যায় পাহাড়ি কলার দিকে নজড় পড়তেই দুটো কলা খেয়ে নিলাম। বেশ সুস্বাদু। 

সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলাম। প্রায় প্রতিটি দোকানে বিক্রেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে মেয়েরা। উপজাতি মেয়েরা কোন রকমের প্রসাধনী ব্যবহার করা ছাড়াই এত সুন্দর যে কেবল বেরসিক মানুষই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে। অত্যন্ত মৃদুভাষী ও সুহাসিনী সে মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য শুভ কামনা রইল। 

রাত আটটার পর বাইরে থাকার অফিসিয়াল বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেনাবাহিনীর লোকজন তেমন একটা বাধা দেয়না। তবে সাধারণত নয়টার পর কেউ বাইরে থাকেও না। 

হাতে থাকা টর্চ লাইটের আলোয় হঠাৎ খেয়াল করলাম, রাস্তার দু'ধারে এবং বিভিন্ন ঝোপের আড়ালে সেনাবাহিনীর সৈনিকদের সশস্ত্র নজরদারি। মূলত স্থানীয় বসবাসকারী, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই তাদের এ তৎপরতা।

রাতে বারবিকিউ করার কথা থাকলেও পরে আমরা এ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসি। নিরিবিলি পরিবেশে আমরা এসেছি প্রকৃতিকে উপভোগ করতে, কোলাহল তৈরি করতে নয়।

রাতের খাবার আবারও জুম চাষের চালের ভাত, ডিম, আলু ভর্তা ও ডাল দিয়ে শেষ করলাম।

ঘুমানোর সময় মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে অডোমস ক্রিম ও গ্যুদরাজ এর গুডনাইট ফেব্রিক রোল-অন ড্রপ ব্যবহার করলাম। ভাল কাজে দিয়েছে।

ও আচ্ছা, বলতে ভুলে গেছি আমরা সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত একটি কটেজে উঠেছিলাম যেখানে ভাড়া মাত্র ২০০ টাকা। একটি রুমে ১০ জন ঘুমাতে পারেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে কটেজের বাইরে আসতেই আমি তো নির্বাক। মেঘে ঢেকে গেছে আমাদের পুরো কটেজ। মনে হচ্ছে মেঘ তার চাদর দিয়ে সারারাত আমাদের জড়িয়ে রেখেছিল। ধবধবে সাদা মেঘ হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। ভ্লগের জন্য লেকের পাশের এ দৃশ্যের কয়েকটা ভিডিও শটসহ কয়েকজনের রিভিউ নিলাম।

খিচুরি, ডিম ভাজি আর আলু ভর্তা দিয়ে সকালের নাস্তা খেতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, লেকের পাড়ে গিয়ে খেলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। খিচুরির প্লেট হাতে নিয়ে সোজা চলে গেলাম লেকের পাড়ে। কয়েক হাজার বছরের পুরনো এক বড় পাথরের উপর বসে খিচুড়ি খেতে খেতে সাদা মেঘের খেলা দারুণ উপভোগ করলাম।

পরে খেয়াল করলাম, ক্যামেরায় টাইম ল্যাপস সেট থাকায় মেঘের আনাগোনার অসাধারণ একটা মুহূর্ত ধরা পড়েছে।

খাওয়া-দাওয়া শেষ। এবার শুরু হবে মূল খেলা। বড় ব্যাগ থেকে একবারে না নিলেই নয় এমন কয়েকটা জিনিস বের করে ছোট একটা ব্যাগে নিয়ে বড় ব্যাগটা রবার্ট দাদার কটেজে রেখে পায়ে হেঁটে রওয়ানা হলাম কেওক্রাডং এর উদ্দেশ্যে...