প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন
রোমান শেখ
আপডেট: ২০২৬-০৮-১৩ , ০৪:২৯ পিএম
ছবি: নাগরিক পত্রিকা
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার রৌফবাদে বিহারী (উর্দুভাষী) জনগোষ্ঠীর জায়গা-জমি কেনাবেচা যেন থামছেই না। তারা জায়গা-জমি কেনাবেচা এবং এর আইনি অবস্থা অত্যন্ত জটিল জেনেও টাকার লোভে 'পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন' অমান্য করে নিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে অন্যদের কাছে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি নাগরিক পত্রিকার কাছে আসা এমন একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে আরও একাধিক তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। যা আগামীতে ওইসব তথ্যের ভিত্তি অনুসন্ধান করে প্রকাশ করা হবে।
লক্ষীপুরের বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা। প্রায় ১৫ বছর আগে তারা রৌফবাদ এলাকার ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা নামে এক বিহারী (উর্দুভাষী) ব্যক্তির জায়গা ক্রয় করেন। প্রায় ৫ কাঠা জায়গাটি তিনি ক্রয় করেন ৪৭ লাখ টাকার বিনিময়ে।
শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা জায়গাটি কেনার সময় নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের ওপর টাকা লেনদেন এবং জায়গাটির হোল্ডিং নাম্বার উল্লেখ করেন। যেখানে তার ক্রয়কৃত জায়গাটির হোল্ডিং নাম্বার ৬৯, ৭০, ৭১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাগরিক পত্রিকার অনুন্ধানে জানা যায়, জায়গাটি শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহার কাছে বিক্রির আগে ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা এবং তার ভাই-বোন মিলে ১৭ জন সেখানে বসবাস করতেন। পরে বিভিন্ন কারণে কেবল ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা ছাড়া বাকি সবাই অন্যত্র বসবাস করা শুরু করলে ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা জায়গাটি শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহার কাছে বিক্রি করে দেন। বিক্রির সময় জায়গাটির অন্য শরীকদের মধ্যে ৭ জনের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বাকি মোক্তার আহম্মেদ ও তার ৬জন শরীক এবং ফরিদা বেগম ও তার ১ শরীকের তথ্য গোপন করা হয়েছে। যাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে তারা হলেন, মো: রাজু, শাকিলা বেগম, রাজিয়া সুলতানা, রোমানা পারভিন রানি, রোজী আক্তার, ফাতেমা বেগম এবং ফোরকান আলী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ক্রয়ের পর শাহাদাৎ হোসেন বাহার এবং মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা জায়গাটিতে দীর্ঘ সময় যাবৎ সংস্কার এবং উন্নয়ন করে প্রায় ২০টি ভাড়াঘর নির্মাণ করে একটি কলোনী তৈরি করেন। সেটির নাম দিয়েছেন ‘বাহার মিয়া কলোনী।’ এসব ভাড়াঘর থেকে প্রতি মাসে তারা প্রায় ৮০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া সংগ্রহ করেন। রয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের আবাসিক গ্যাস সংযোগও।
সূত্র বলছে, ২০০৯ সালের পর থেকে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও বাহার এবং সামশুদ্দোহা মিলে জায়গাটি ক্রয় করেন ২০১১ সালের দিকে। সে সময়ে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও তারা কীভাবে সংযোগ স্থাপন করলেন; কাদের ম্যানেজ করে করলেন- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, বিহারী ক্যাম্পগুলোতে অতীতে সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিনামূল্যে বা সরকারি খরচে বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের বিশেষ সুযোগ থাকলেও লাইনের গ্যাসের ক্ষেত্রে এমন কোনও সরকারি ছাড় বা বিশেষ ফ্রি সংযোগের ব্যবস্থা নেই।
রৌফবাদের স্থানীয় এক উর্দুভাষী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাগরিক পত্রিকাকে জানান, অত্র এলাকায় এমন বহু জায়গা ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে; যা এখনও চলমান রয়েছে। এসব জায়গা বিক্রিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তারা সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে বয়-বিক্রি করছে।
তিনি বলেন, জায়গা বিক্রি এবং ক্রয়ে উভয়ের মধ্যে কেবল নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত এবং সাক্ষির ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় হয়। স্ট্যাম্পে কেবল জমির পরিমান, হোল্ডিং নাম্বার, টাকার পরিমান, উভয় পক্ষের নাম-ঠিকানা এবং সাক্ষি উল্লেখ থাকে।
বিহারীদের সংগঠন এডহক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন লিটন নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, জায়গাটি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ডিআরআরও (জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন) শাখার তৎকালীন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান মজুমদারকে জানানো হয়েছে। তিনি কোনও ধরনের পদক্ষেপ নেননি। বরং এডহক কমিটির জাহিদ হোসেন লিটনকে ওই কর্মকর্তা বলেন ‘‘যারা আছে তারা এখানে বিল্ডিং বানাবে এবং আমরা এখানে এসে থাকবো।’’
এডহক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন লিটন বলেন, তিনি এডহক কমিটিতে আসার পর থেকে অনেক অভিযোগ এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসের বেহাত বা বেদখল হওয়া প্রায় ৮ একর ৪১ শতাংশ জায়গা উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের অফিসে গেলে সেখানের সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তারা তাকে সহযোগিতা না করে বরং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে যাওয়া হয় তাদের উল্টো সহায়তা করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরও একজন বাসিন্দা নাগরিক পত্রিকাকে জানান, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ১১ দাগের ৪ গন্ডা জায়গায় একটি বহুতল ভবন নির্মানের কাজ চলছে। যা রুবেল নামে এক ব্যক্তি নির্মাণ করছেন। স্থানীয় ওই ব্যক্তির দাবি, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দপ্তরের ডিআরআরও কর্মকর্তাসহ জেলা প্রশাসককে লিখিত একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে কোনও ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে ঘুরে চলে যায় এবং রহস্যজনক কারণে ওই ভবনের নির্মাণ কাজ কেউই যেন বন্ধ করার সাহস বা ক্ষমতা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, রৌফবাদের ১ নং খতিয়ানের ২৪ শতাংশ জায়গা দখল করে সোলায়মান, ফারুক, রনি নামে একটি অসাধু চক্রের সদস্যরা কিছু দোকানপাট নির্মাণ করছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দপ্তর এবং চাঁন্দগাঁও ভূমি সার্কেল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা সশরীরে এসে দেখে রহস্যজনক কারণে ফিরে চলে যায়। কোনও ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেন না।
বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন (ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২) অনুযায়ী এই ধরনের সম্পত্তি বা জায়গা অনানুষ্ঠানিক বা কাগজের চুক্তির কোনও আইনি বৈধতা না থাকলেও এমন বসত-ভিটা বা জায়গা কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় বিক্রি হচ্ছে তা নিয়ে- সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ম্যানেজ হয়ে এসব জেনেও না জানার ভান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান নাগরিক পত্রিকাকে বলেন, কোনও অভিযোগ পেলে বা পত্রিকায়/মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করি। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত একটি কমিটি রয়েছে যারা অভিযোগ এবং প্রতিবেদনের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করে।
নাগরিক পত্রিকায় এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তিনি প্রতিবেদনের কপি বা লিংক পাঠাতে অনুরোধ করেন।
সূত্র মতে, ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বিহারী সম্প্রদায়ের মানুষ বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার পান। এর ফলে বর্তমানে তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলাদা কোনও বিশেষ সুবিধা বা কলোনিভিত্তিক ছাড় পাওয়ার আইনি সুযোগ নেই; বরং সাধারণ নাগরিকদের মতোই বাণিজ্যিক মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে ব্যবহার করতে হলেও ক্রেতা বাহার এবং সামশুদ্দোহা কীভাবে এই গ্যাস সংযোগ স্থাপন করছেন- এমন প্রশ্নে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের জেনারেল ম্যানেজার, সিনিয়র প্রকৌশলী আবু জাহেরকে একাধিকবার মুঠো ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার কোনও বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তবে, এই দপ্তরের জেনারেল ম্যানেজার, প্রকৌশলী রফিক খান (বিক্রয় ও বিতরণ) নাগরিক পত্রিকাকে জানান, এ ধরনের গ্যাস সংযোগ অবৈধ। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জায়গাটি কোন প্রক্রিয়ায় এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেন কিনলেন-মুঠোফোনে এমন প্রশ্ন করা হয় ক্রেতা শাহাদাৎ হোসেন বাহারকে। তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে, তার বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
জায়গাটির বিক্রেতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা বক্তব্য জানতে তার মুঠো ফোনে কল করা হলে তিনিও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে, তিনি কোন আইনে সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসের এই জায়গাটি বিক্রি করেছেন সে বিষয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
Editor-in-Chief : Roman Sheikh
Telephone : +88 02-3333 98 040
Mobile : +88 017 111 43 818
Email Address :
news@nagorikpatrika.com.bd
editor@nagorikpatrika.com.bd
roman.nagorikpatrika@gmail.com
Address
Naya Nagar, Word-1, (KCC-Kotwali)
Uttara-12, Dhaka, Bangladesh.