তুষারঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ অঙ্গরাজ্যে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু

 নাগরিক পত্রিকা ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০১-২৮ , ০৪:৩২ পিএম

তুষারঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ অঙ্গরাজ্যে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু ছবি: নাগরিক পত্রিকা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলজুড়ে আঘাত হানা শক্তিশালী তুষারঝড়ে এ পর্যন্ত ১৪টি অঙ্গরাজ্যে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংবাদমাধ্যম। তুষারপাত, বরফাচ্ছন্ন রাস্তা ও হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে নিউইউর্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি জানান, আট বছরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। এছাড়াও নিহতদের সবাইকে বাইরে পাওয়া গেলেও তারা গৃহহীন ছিলেন কি না তা নিশ্চিত নয় প্রশাসন। একইসাথে নিউইয়র্ক সিটিতে সবচেয়ে বেশি ১০ জন মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন মামদানি। 

নাগরিক পত্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছেন।

নিউইয়র্ক থেকে নাগরিক পত্রিকার চীফ কান্ট্রি করেসপন্ডেন্ট সৈয়দা এসএ মঈন জানান, নিউইয়র্কে ভারী তুষারপাতের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বরফে ঢেকে যাওয়ায় সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলোতে শত শত ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে স্কুল, কলেজ ও অনেক অফিস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বরফে পিচ্ছিল রাস্তায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ায় কর্তৃপক্ষ জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।

শুক্রবার শুরু হওয়া এই ঝড় সপ্তাহান্তে বড় পরিসরে তুষারপাতে রূপ নেয়। এতে সড়কের যোগাযোগ ব্যাহত হয়, বহু ফ্লাইট বাতিল এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। সোমবার ঝড়ের তীব্রতা কমলেও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা রয়ে গেছে, যা আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মিশিগান প্রতিনিধি মুরাদ হোসেন জানান, মিশিগানে তীব্র শীত ও তুষারঝড়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। ঝড়ের কারণে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বহু এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে।হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও গরমের ব্যবস্থা ছাড়া দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। তীব্র ঠান্ডায় বয়স্ক ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে গেছে। উদ্ধার ও মেরামতকারী দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন ছিল। যার জন্য শহরগুলোতে জরুরি সেবা প্রদানকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে যারা বিশেষ করে গৃহহীনদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।

ওহাইও প্রতিনিধি আব্দুস সালাম হাওলাদার জানান, ওহাইওতে বরফে ঢাকা পিচ্ছিল সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। কয়েকটি দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। চালকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্যজুড়ে সতর্কতা জারি রয়েছে।

চরম আবহাওয়ার কারণে আবাসন ও নগর উন্নয়ন দপ্তরের বাধ্যতামূলক গৃহহীন গণনা ফেব্রুয়ারির শুরুতে পিছিয়েছে। মামদানি জানান আউটরিচ কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ নয় বরং আমাদের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়াতেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।

বাফেলো প্রতিনিধি দেওলায়ার হোসেন জানান, বাফেলোতে এবারের তুষারপাতকে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। কয়েক ফুট বরফে শহরের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। খাবার ও চিকিৎসা পৌঁছে দিতে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। প্রশাসন নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

শহরের তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র ও দুটি অতিরিক্ত কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এই গৃহহীন মানুষদের জন্য পুলিশ, দমকল ও জরুরি সেবা প্রদানকারী কর্মীরা অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন। ন্যাশভিল রেসকিউ মিশনে সাধারণত রাতে ৪০০ জন মানুষ থাকলেও এই শৈত্যপ্রবাহে সংখ্যাটি বেড়ে প্রায় ৭ হাজারে পৌঁছেছে।

ভার্জিনিয়া প্রতিনিধি শহিদুল্লাহ ওসমানী জানান, ভার্জিনিয়ায় তুষারপাতের ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরফে ঢেকে যাওয়ায় অনেক সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জরুরি সেবা পৌঁছাতে প্রশাসনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের সতর্ক থাকার এবং অপ্রয়োজনীয় চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

সারা দেশে তুষারঝড় সম্পর্কিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাইপোথার্মিয়া, অতিরিক্ত ঠান্ডায় হৃদরোগজনিত জটিলতা এবং বরফ পরিষ্কার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কথা জানানো হয়েছে। সপ্তাহান্তে টেক্সাসের বোনহ্যামে বরফে জমা একটি পুকুরে পড়ে তিন কিশোরের মৃত্যু হয়। কানসাস, কেনটাকি, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, সাউথ ক্যারোলাইনা, টেনেসি ও মিশিগানেও এমন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

ক্যালিফোর্নিয়া প্রতিনিধি খুরশীদা বকস জানান, সাধারণত উষ্ণ ক্যালিফোর্নিয়ায় এবছর অস্বাভাবিক তুষারপাত দেখা গেছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বরফ জমে সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। তীব্র আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে। ভূমিধসের আশঙ্কায় কিছু এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসন জনগণকে সতর্ক থেকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে আরেকটি তুষারঝড় আঘাত হানতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন। এখনও অন্তত ২০ কোটি আমেরিকান কোনো না কোনো শীত সতর্কতার আওতায় আছেন, যা ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে।