ইরানে রাস্তায় এবার সরকার সমর্থকরা

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আপডেট: ২০২৬-০১-১৩ , ০৭:০৮ এএম

ইরানে রাস্তায় এবার সরকার সমর্থকরা ছবি: নাগরিক পত্রিকা

রানের সরকারবিরোধী আন্দোলন একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ৪৭বছরের ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশ জুড়ে শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দমন-পীড়ন চালালে বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতায় দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জবাবে ঐ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সহযোগীদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলা কূটনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। কিন্তু ইরানে বিক্ষোভের আগুন বন্ধ হয়নি। দেশটির রাস্তায় এবার সরকার সমর্থকরা নেমেছে।

ইরান জুড়ে ব্যাপকতা

বিশ্লেষকদের বিশ্বাস এবারের বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও তীব্রতার কারণেই এটি আগেরগুলোর তুলনায় 'নজিরবিহীন বা অভূতপূর্ব'। সমাজবিজ্ঞানের গবেষক এলি খোরসান্দফার বলেন, ইরানের বড় শহরগুলোতে যখন সমাবেশ হচ্ছিল, তখন তা ছড়িয়ে পড়ছিল ছোট শহরগুলোতেও, 'যাদের নাম মানুষ এমনকি আগে শোনেওনি'। ইরান এর আগেও অনেক বিক্ষোভ দেখেছে। নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ করে ২০০৯ সালের কথিত গ্রিন মুভমেন্টে নেতৃত্ব দিয়েছিল মধ্যবিত্তরা। তখন সেটি সীমাবদ্ধ ছিল বড় শহরগুলোতেই। আর ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন ছিল গরিব এলাকাগুলোতে। এবারের সঙ্গে তুলনা করার মতো আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ২০২২ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে মাহশা আমিনের মৃত্যুর ঘটনার পর।

চলমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ জন সদস্য নিহত হয়েছে। সরকারের দাবি, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাসীদের মাঠে নামানো হয়েছে। তারাই বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে নিয়ে গেছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও বিক্ষোভকারীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, হাসপাতালে নিহতের স্তূপ লক্ষ করা গেছে। তেহরানের একটি মর্গে তোলা ফুটেজ থেকে কমপক্ষে ১৮০টি সাদা কাফন পরা মরদেহ গণনা করেছে বিবিসি। গতকাল সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত সদস্যদের মরদহে নিয়ে কফিন মিছিল বের হয়। দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ গতকালও বন্ধ ছিল।

সরকারপন্থিদের সমাবেশ

ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারের পক্ষে সমাবেশ করার ছবি প্রকাশ করেছে ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (আইবিসি)। এই সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের হামিদান ও ইলামসহ কয়েকটি শহরে এই সরকারপন্থি মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্প্রতি ইলাম ও হামিদান ছিল সেই শহরগুলোর মধ্যে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে বারবার বিক্ষোভ করছিল।

অন্যান্য শহরের তুলনায় ভিন্নভাবে সরকারের পক্ষে এই মিছিল গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আহ্বানে এই সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে ইরানের বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশনে নাগরিকদের এসব সমাবেশ বা মিছিলে অংশ নিতে আহ্বান করা হয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট, সংসদের স্পিকার এবং বিচার বিভাগের প্রধান ছাড়াও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নাতি হাসান খামেনিসহ বেশ কয়েক জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জনগণকে এই মিছিলে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে প্রিন্স রেজা পাহলভি বলেছেন, খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাবে।

কূটনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান সমঝোতার জন্য যোগাযোগ করেছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানি নেতারা 'নেগোশিয়েট বা সমঝোতা'র জন্য যোগাযোগ করেছেন। কেননা তিনি দেশটিতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন। বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ তারা গতকাল ফোন করেছে'। রবিবার রাতে ট্রাম্প বলেন, 'তারা সমঝোতা করতে চায়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, বৈঠকটি আয়োজন করা হচ্ছে, তবে বৈঠকের আগে যা ঘটছে, তার কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।'

ইরান সরকারের তরফ থেকে ট্রাম্পের এ দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি 'গুরুতর ও বাস্তব সমঝোতা'র জন্য প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, 'আমরা যুদ্ধ চাই না, তবে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছি। সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত।' বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এক গ্রুপে বক্তৃতা করার সময় তিনি বলেছেন, 'আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু সেটি হতে হবে ন্যায্য আলোচনা, সমানাধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে।'

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদসম্মেলনে জানিয়েছেন, আব্বাস আরাঘচি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ হুইটেকারের মধ্যে 'যোগাযোগের চ্যানেল খোলা' রয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজন হলে তথ্যও আদান-প্রদান করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আগাম হামলা ইরানের এজেন্ডা নয়। এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন, 'ইরানে বিক্ষোভের দিকে নজর রাখছে বেইজিং। তবে আমরা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করি।' সব দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো উচিত বলেও তিনি জানান।