প্রতিকার চেয়ে বিশদ চিঠি

গভর্নরের ওপর ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা

 অর্থনৈতিক ডেস্ক
আপডেট: ২০২৫-১১-১২ , ০২:৫০ পিএম

গভর্নরের ওপর ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ছবি: নাগরিক পত্রিকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সাম্প্রতিক সময়ে গভর্নরের নানাবিধ সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক আচরণ এবং কর্মপরিবেশ সংকটকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কাউন্সিলের পক্ষ থেকে গভর্নরের কাছে পাঠানো একটি বিস্তৃত লিখিত অভিযোগপত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের একটি গভীর চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও তার কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত একটি ঐতিহ্য হলো গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ। কাউন্সিলের দাবি, এ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মতো কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান ভবনের ৪র্থ তলায় অবস্থিত এক্সিকিউটিভ ফ্লোরে হঠাৎ করে সকল প্রবেশদ্বার তালাবদ্ধ করে দেওয়া। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এখন শুধুমাত্র লিফট ব্যবহার করে ওই ফ্লোরে যেতে হচ্ছে, যা নজিরবিহীন এবং কর্মকর্তাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।

এ সিদ্ধান্তকে কর্মকর্তারা দেখছেন প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরির একটি ইঙ্গিত হিসেবে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন বিরূপ পদোন্নতি নীতিমালা কিংবা কর্মকর্তাদের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করতে গভর্নর ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছেন।

এমনকি মহিলাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, বাইরের লোকদের ব্যবহারের পথ দিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ায় তাঁদের জন্য এটি নিরাপত্তাহীন ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সংস্কারের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারাও অংশগ্রহণমূলক সংস্কার প্রত্যাশা করেছিলেন।

কাউন্সিল জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণের জন্য ১৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের সামনে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়েছিল। গভর্নর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে কাউন্সিলকে সংস্কার কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কিন্তু আট মাস পার হলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পদশূন্যতার সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে। চলতি বছরের ৩০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী ৬,২৬০ প্রথম শ্রেণির পদের মধ্যে ১,৯৩৬টি এখনও শূন্য; নির্বাহী পরিচালকের ৪টি পদ বহু বছর ধরে খালি। চলতি বছরের ১৯ মের পর অতিরিক্ত পরিচালক পর্যায়েও কোন পদোন্নতি হয়নি এবং গত ৩১ আগস্ট ভিত্তিক প্যানেল এখনও অনুমোদিত হয়নি।

কাউন্সিল আরও বলছে যোগ্য কর্মকর্তারা অবহেলিত হচ্ছেন, এবং পদোন্নতির অগ্রগতি ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হচ্ছে।

দুদকের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদের বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শন করতে হয়েছে। কিন্তু পরিদর্শকরা আইন অনুযায়ী কাজ করলেও দুদকের প্রতিবেদনগুলিতে তাদেরকেই অনিয়মের জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারি ব্যাংকের ঋণবরাদ্দের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি সংশ্লিষ্ট না থাকলেও দুদকের অভিযোগপত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে গভর্নরকে বহুবার অবহিত করলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরকারের অন্যান্য সংস্থার ৫ম গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তা পাচ্ছেন না। কাউন্সিল বিষয়টি বারবার জানালেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো পদক্ষেপ নেই। কর্মকর্তাকর্মচারীদের ব্যক্তিগত লকার হঠাৎ করে ফ্রিজ করে দেওয়ায় তাঁরা বিব্রত ও বিপাকে পড়েছেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানের মূল্যবান জিনিসপত্রও ব্যবহার করতে পারছেন না।

সিনিয়র কর্মকর্তা জুনিয়রদের চেয়ে কম বেতন পাওয়ার মতো অস্বাভাবিকতা দূর করতে সরকারী ব্যাংকের উদাহরণ থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকে তা ঝুলে আছে দীর্ঘদিন।

কাউন্সিলের অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে গভর্নর ব্যয়বহুল উপদেষ্টাপরামর্শকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এদের অনেকে দেশের ব্যাংকিং পরিবেশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত অবহিত নন। ফলে অনেক পরামর্শ ব্যাংকের বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কর্মপরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কাউন্সিল আরও জানিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জরুরি সাক্ষাতের অনুরোধ করলেও গভর্নর ছয় মাসে একবার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত অগুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে গভর্নর নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন, যার ফলে দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথি নিষ্পত্তি বিলম্বিত হচ্ছে। ট্রেনিং একাডেমির প্রেষণ ভাতা বাতিল, প্রশিক্ষণের মেয়াদ ও ভাতা কমানোসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

কর্মকর্তারা মনে করেন এসব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল করতে নেওয়া হয়েছে। কাউন্সিল এসব বিষয়ে অনেকবার গভর্নরকে অবহিত করলেও তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংক অতীতে স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতিমালার কারণে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বলা হচ্ছে কর্মকর্তারা নাকি অদক্ষ, তাই নীতিমালা পরিবর্তন করা হবে।

কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ না নিয়েই নীতিমালা পরিবর্তন করলে এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অসন্তোষ নিরসনে কাউন্সিল দুইটি প্রধান দাবি জানিয়েছে। এগুলো হলো; দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও প্রতি ১৫ দিনে গভর্নরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক।

কাউন্সিল জানিয়েছে তারা সবসময়ই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করে এসেছে, এবং ভবিষ্যতেও গভর্নরের সঙ্গে সহযোগিতায় প্রস্তুত; তবে এজন্য উন্মুক্ত যোগাযোগ কাঠামো ও আস্থার পরিবেশ জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই অসন্তোষ যদি দ্রুত সমাধান না করা হয়, তবে দেশের আর্থিক খাতের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক সংকটে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালীকরণের স্বার্থে গভর্নরের প্রতি তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান ও অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।